পৃথিবীর সর্বপ্রথম শিল্পকলা-নৃত্যকলা – প্রসেনজিৎ মুখোপাধ্যায়

পৃথিবীর সর্বপ্রথম শিল্পকলা-নৃত্যকলা : উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিক্ষা ও চর্চার সূত্রে একসময় কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলিতে অনুষ্ঠিত সমস্ত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত সম্মেলন গুলিতে যোগদান করতাম আমি ও আমার অভিন্ন হৃদয় সুহৃদ সনৎ দাস। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসরগুলির মধ্যে যেগুলো নামজাদা ছিল তাদের আবশ্যিক একটা বিষয় থাকত নৃত্য। কথ্থক, ভরতনট্টম, ওড়িশি, কথাকলি, কুচিপুড়ি আরও কত রকমের নৃত্য। সেই সকল নাচ দেখতে দেখতে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের ওপরে মনের অগোচরে কোথায় যেন একটা ভাল লাগা জন্মে গিয়েছিল। ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের মধ্যে আমার সবথেকে বেশি ভাল লাগে কথ্থক।

পৃথিবীর সর্বপ্রথম শিল্পকলা-নৃত্যকলা - প্রসেনজিৎ মুখোপাধ্যায়

[ পৃথিবীর সর্বপ্রথম শিল্পকলা-নৃত্যকলা – প্রসেনজিৎ মুখোপাধ্যায় ]

তারপরে পর্যায়ক্রমে ভরতনট্টম, ওড়িশি ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ভাল লাগার সূত্রে একবার কলামন্দির অনুষ্ঠিত পরপর সাত দিন Dance Festival দেখেই ফেললাম। ফেসবুকে আমার অনেক ভগিনীরা ও অনেক মিত্রারা আমার কাছে অনুরোধ জানিয়েছে নৃত্যকলা বিষয়ে যেন আমি কিছু লিখি। আমার সীমিত অভিজ্ঞতার ভান্ডার থেকে যতটুকু আমি জানি তা, আপ্রাণভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

গান, বাদ্য আর নৃত্য ——-এই তিন নিয়ে হল সঙ্গীত। ‘নাচ’ ছোট্ট দুটি অক্ষরের শব্দ। কিনতু কী শক্তিশালী, তাৎপর্যপূর্ণ এবং ব্যঞ্জনাময়! এই নাচই এক ভাষা, যার দ্বারা আদিম মানুষ নিজেদের মধ্যে ভাব ও মতের আদানপ্রদান করত। সে যুগে গুহাবাসী পর্বে, অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় দু’লক্ষ বছর আগে যখন ছিল গুহামানবের যুগ—শিকারজীবী পর্ব, সেইসময় মানুষ কথা বলতো অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে। আকার-ইঙ্গিতে হাবভাবের মাধ্যমে আদিম মানুষের ভাবপ্রকাশের যে প্রক্রিয়া সেটাই পরবর্তীকালে শিল্পজগতে মূকাভিনয় বা মাইম নামে পরিচিত হয়েছে। নৃত্যকলার ওপর নাম ইঙ্গিতকলা।

প্রসঙ্গত অ্যারিস্টটল বলেছেন, ‘নাচ’ ‘কাজের’ সমার্থক। এই কথার তাৎপর্য সহজেই অনুমেয়। মানুষের প্রথম ও প্রধান কাজ ছিল জীবনধারণ এবং এই কাজ হতো নাচের মাধ্যমে। যেমন আদিম যুগে শিকারি নাচ, পরবর্তীকালে ধানকাটার নাচ, ভূমিপূজার নাচ। পৃথিবীর প্রাচীনতম নাচ হল শিকারভিত্তিক, এরপরের প্রাচীন নাচ পশুপালনভিত্তিক এবং তারপর কৃষিভিত্তিক। গুরুসদয় দত্ত মহাশয় ব্রতচারী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নৃত্যর সঙ্গে কর্মের সংযোগকে আরও দৃঢ়তররূপে প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন।

মনিপুরি নৃত্য [ Ras Lila ]
মনিপুরি নৃত্য [ Ras Lila ]
এখানে খুব সহজেই একটা কাল্পনিক ছবি সৃষ্টি করা যাক। এক বিরাট আসর বসেছে গভীর জঙ্গলে। বহু নারী-পুরুষ-শিশু ঘিরে রয়েছে একটি মৃত বরাহকে—-একদল পুরুষ হাত-পা নেড়ে সারা শরীর দিয়ে অঙ্গভঙ্গি বা মিমিক্রি করে অপরাপর সবাইকে বোঝাচ্ছে কী করে তারা এই পশুটিকে শিকার করেছে। এই-ই সূত্রপাত বর্তমান মাইমের। ছবিতে দেখা যাচ্ছে কয়েকজন মিলে হাতে তালি দিচ্ছে, ও তালির তালে তালে সবাই শরীর আন্দোলিত করছে। ছন্দের আভাসটা পরিষ্কার বোঝা যায় এর মাধ্যমে। এভাবেই সূত্রপাত বর্তমান নৃত্যের। ছবির যে শিশুরা সেদিনের দর্শক, ভবিষ্যতে তারাই পরের ছবির সৃষ্টিকর্তা। এভাবেই দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর সর্বপ্রথম শিল্পকলা—-নৃত্যকলাই, নানা বিবর্তনের পথে গিয়ে পরিবর্তিত, পরিমার্জিত, পরিশীলিত হয়ে শিল্পে রূপান্তরিত হয়েছে।

ভারতনাট্যম [ Bharata Natyam Performance DS ]
ভারতনাট্যম [ Bharata Natyam Performance DS ]
আরও গর্বের ও আনন্দের কথা এই যে, এই শিলওপকলা পৃথিবীর যে কটি দেশে সমৃদ্ধি লাভ করেছিল তার মধ্যে আমাদের ভারতবর্ষ অন্যতম। প্রাচীন গ্রীস, মিশর, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া,চীন, ভারত প্রভৃতি দেশে এই নৃত্যকলা আদৃত বহুল পরিমাণে চর্চিত। খ্রিষ্টজন্মের বহু পূর্বেই হরপ্পা সভ্যতা, যা কিনা পাঁচ হাজার বছর আগের, তাতে আমরা পাই নৃত্যরত মূর্তির ভগ্নাবশেষ। এই ধারাতে এরপর পাই ওড়িশার জৈন রাজা খারবেলের খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের শিলালিপিতে নাচের সুস্পষ্ট প্রমাণ। এর আগে খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচশো বছর আগে তক্ষশীলার একটি সমাজচিত্রে পাই প্রাত্যহিক নাচের উল্লেখ—-‘নাচ এমন একটা ব্যায়াম, যাতে মন কখনও বিরূপ হয় না। এতে যেমন সারা শরীর পুষ্ট হয়, তেমনি মনের জড়তাও দূর হয়ে যায়। সারাদিনের কাজকর্মের পর সন্ধ্যায় কয়েক পাত্র সুরার সঙ্গে নৃত্য, পরের দিনের নতুন শক্তি সঞ্চয় করে। নাচ মানুষের পক্ষে চরম উপকারী।’ আমাদের দেশে নাট্যশাস্ত্রও রচিত হতে শুরু করেছিল খ্রিষ্টজন্মের পূর্বেই।

নৃত্যকলাকে আমরা বলি Mother Art’। জীবনের শুরু থেকেই মনের ভাব প্রকাশ করবার মাধ্যম ছিল নাচ। সৈয়দ মুজতবা আলি তাঁর ‘ভারতীয় নৃত্য’ প্রবন্ধে বড় সুন্দর বলেছেন—–‘ নৃত্য জীবনীশক্তির চরম বিকাশ। যেসব কলা দ্বারা মানুষ তার সৌন্দর্যানুভূতি প্রকাশ করে, তাহাদের গভীরতম মূল নৃত্যরস হইতে প্রাণ সঞ্চয় করে। অন্যান্য কলা সৃষ্টি হইবার বহু পূর্বে মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত, আড়ম্বরহীন নৃত্য দ্বারা তাহার অনুভূতি প্রকাশ করিয়াছে—-অপরের হৃদয়ে সেই রস সঞ্চারিত করিবার জন্য এই সরল কলাই তখন তাহার একমাত্র আশ্রয়ও ছিল। আদিম মানবের বাদ্যযন্ত্র ছিল না, ধ্বনি বিশ্লেষণ করিয়া সঙ্গীতের সৃষ্টি করিতে তখনও শিখে নাই, প্রতিমা নির্মাণের যন্ত্রপাতিও তাহার ছিল না। চিত্রাঙ্কনের সরঞ্জাম তাহার কাছে তখনও অজানা। অনুভূতি প্রকাশ করিবার একমাত্র পন্থা ছিল তাহার নিজের দেহ, সেই দেহ সে সাবলীল ছন্দে তালে তালে আন্দোলিত করিয়া তাহার সুখ-দুঃখ, ভয়-ঘৃণা প্রকাশ করিত। সভ্যতার ক্রম বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অনুভূতি সূক্ষ্ম হইতে সূক্ষ্মতর রূপ গ্রহণ করতি লাগিল—-নৃত্যও তাহার সঙ্গে যোগ রাখিয়া সুকুমার কলায় পরিণত হইল। মানুষ নৃত্য দ্বারা তাহার সূক্ষ্মতম ও গভীর অনুভূতিকে রূপ দিতে শিখিল। সাবলীল ছন্দে তাল সহযোগে দেহ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আন্দোলন দ্বারা মানুষ যখন তাহার জীবনীশক্তির চরম সত্তাকে সপ্রকাশ করিয়া তুলে তখনই তাহা নৃত্যের রূপ ধারণ করে।’

নৃত্র প্রসঙ্গে আমরা বলতে পারি—–নৃত্যকলা বলতে বোঝায় ছন্দোবদ্ধভাবে নানা ভঙ্গি। শাস্ত্র অনুসারে তা আবার তিনভাগে বিভক্ত—- নৃত্ত-নৃত্য-নাট্য। নৃত্যের উৎপত্তি সম্বন্ধে নৃতাত্ত্বিকরা বলেন—-মিনুষের মুখে যখন ভাষা ছিল না তারও আগে নৃত্যের জন্ম। সংস্কৃতিকে যদি সভ্যতার নির্যাস রূপে কল্পনা করা যায় তাহলে এই সংস্কৃতির চতুরঙ্গ হচ্ছে নৃত্যকলা, চিত্রকলা, সঙ্গীত ও সাহিত্য। প্রতিমা দেবী তাঁর নৃত্য গ্রন্থে লিখেছেন—-‘বিশ্বজগতের মর্মে যে অনাদি চাঞ্চল্য, অস্তিত্বের যে অসীম আবেগ, তাই মিলল এসে পাখির দেহের ছন্দে, মিলল তার মনের চাঞ্চল্যে, মিলল তার প্রাণের আবেগে বন রঙ্গভূমিতে, তার থেকে দেখা দিল নাচ।’

প্রাণিজগতে নৃত্যের ছন্দোবদ্ধ মূর্তি চিত্রকর ও ভাস্করের মনে আনল সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা—- পরে তাতে ঝঙ্কৃত হল সুর, সেই ঝঙ্কার থেকে কবি মনে এল কাব্য। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন—-

যাকে সংস্কৃতি বলে তা বিচিত্র; তা মনের সংস্কার সাধন করে, আদিম খনিজ অবস্থার অনুজ্জ্বলতা থেকে তার পূর্ণ মূল্য উদ্ভাবন করে নেয়। এই সংস্কৃতির নানা শাখা-প্রশাখা; মন যেখানে সুস্থ সবল, মন সেখানে সংস্কৃতির এই নানাবিধ প্রেরণাকে আপনিই চায়।

 

A 7th century Shiva in Karnataka
A 7th century Shiva in Karnataka

 

নৃত্যের উৎপত্তি বিষয়ে আমরা জানতে পারি প্রধানত দুটি ধারা থেকে। ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের স্তরবিন্যাস ও সমীক্ষার ক্ষেত্রে সমস্ত উপাদানগুলিকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:-
১. মৃতধারার উপাদান (স্থানু বা Static )
২. জীবন্ত ধারার উপাদান ( গতিশীল বা Dynamic )

হাজার বছর ধরে প্রবহমান নৃত্যধারা নানা যুগে পরিবর্তিত হতে হতে বর্তমান যুগে এসে পৌঁছেছে, তাকে বলি জীবন্তধারা। আর যুগে যুগে যে নৃত্যধারাগুলি একসময়ে সমাজে প্রচলিত ছিল কিনতু নানা কারণে সেই রূপে তাদের আর দেখা যায় না, তাদের বিভিন্ন ইঙ্গিত ও উপাদান পাওয়া যায় নৃতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, ভাস্কর্য, চিত্রকলা, শিলালিপি, প্রাচীন পুঁথি ইত্যাদির মধ্যে, তাদের বলি মৃতধারা।

A Bharatanatyam dancer striking a pose during practice
A Bharatanatyam dancer striking a pose during practice

জীবন্ত ধারা:~ আদিবাসী নৃত্য ( Tribal Dance )> আধা লোকনৃত্য ( Quassi Dance )>লোকনৃত্য (Flok )> আধা লোকনৃত্য ও আধা শাস্ত্রীয় নৃত্য (Classical Folk Dance ) >শাস্ত্রী নৃত্য ( Classical )>নব শাস্ত্রীয় নৃত্য ( Neo-Classical )।

মৃতধারা:~ নৃতত্ত্ব (Anthropology )> প্রত্নতত্ত্ব ( Archaeology)>চিত্রকলা ( Painting )> শিলালিপি বা লেখমালা ( Inscription)> প্রাচীন পুঁথি ( Classical Volume)

নৃতাত্ত্বিক উপাদান:~ প্রচীন প্রস্তর যুগে মানুষের জীবিকা ছিল শিকার। এ যুগের মানুষ তাই শিকারজীবি। এল শিকারি নাচ। এরপর নব্য প্রস্তর যুগে মানুষ শিখল পশুপালন। তারা পশুপাখির নানারূপ চলন শিখল। পরবর্তীকালে আমরা নাট্যশাস্ত্রে তার উল্লেখ পাই। এল পশুপালক নাচ। এরপর এল তাম্রযুগ হরপ্পা-মহেঞ্জদড়ো, সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতা ( খ্রিষ্টপূর্ব তিন হাজার বছর )। তখন মানুষ শিখেছে কৃষিকাজ। এল কৃষি সম্পর্কিত নাচ, ফসল তোলার পর আনন্দে নাচ, ধান কাটার নাচ, ভূমিপূজার নাচ ইত্যাদি।

 

একটি ভরতনাট্যম ভঙ্গি [ A Bharatanatyam pose ]
একটি ভরতনাট্যম ভঙ্গি [ A Bharatanatyam pose ]

প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান:~ সিন্ধুসভ্যতার সময়ে যে নৃত্যপরা নারীমূর্তি, বিভিন্ন শিলমোহর পাওয়া যায়, তার থেকে জানা যায় পাঁচ হাজার বছর আগেও ভারতে নৃত্যের প্রচলন ছিল। বিশেষজ্ঞরা ওই মূর্তিটিকে বেলুচিস্তানের অথবা উত্তর-পশ্চিম ভারতের কোনও উপজাতীয় মহিলার মূর্তি বলে বিশ্লেষণ করেছেন।

ভাস্কর্য উপাদান:~ ভারতবর্ষের সর্বত্রই বহু মন্দিরে মূর্তি আছে এবং তার মধ্যে প্রচুর নৃত্যরত মূর্তি বিদ্যমান। এছাড়া শ্লোকসহ ১০৮ করণের মূর্তি দক্ষিণ ভারতের চিদাম্বরম মন্দিরে রয়েছে। কোণারকের সূর্য মন্দির ইত্যাদিতে সর্বত্রই একদা গতিশীল ভঙ্গি স্থানুবৎ রয়েছে।

চিত্রকলার উপাদান:~ বিভিন্ন চিত্রকলার মাধ্যমে সেইসময়ের চিত্রশিল্পীরা তাঁদের জানা নৃত্যের দৃশ্য অঙ্কিত করে গেছেন। ভীমবেটকার প্রগৈতিহাসিক গুহাচিত্র এর সর্বপ্রাচীন প্রমাণ। অজন্তা গুহা থেকে শুরু করে বর্তমান দিন পর্যন্ত চিত্রশিল্পীরা নানা নৃত্যদৃশ্য অঙ্কিত করে গেছেন।

 

একজন মহিলা ভরতনাট্যম নৃত্যশিল্পী একটি অভিব্যক্তি করছেন [ A female Bharatanatyam dancer making an expression ]
একজন মহিলা ভরতনাট্যম নৃত্যশিল্পী একটি অভিব্যক্তি করছেন [ A female Bharatanatyam dancer making an expression ]

শিলালিপি:~ পাহাড়গাত্রে, মন্দিরগাত্রে বহু শিলালিপি থেকে আমরা নাচের উপাদান পাই। তার মধ্যে উল্লেখ্য খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে কলিঙ্গরাজ খারবেলের সময় হাতিগুম্ফার শিলালিপি। এছাড়া অজস্র শিলালিপি যা ভারতবর্ষের নানা স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে।

প্রাচীন পুঁথি:~ নাট্যশাস্ত্রের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখ করতে হয়। রচনাকাল শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে। এছাড়া আরও অনেক পুঁথি পাওয়া যায়, তবে নৃত্যকলা যতটা প্রচীন, নৃত্যকলা বিষয়ক পুঁথি ততটা প্রাচীন নয় বা সম্ভবও নয়। ভারতে সভ্যতার সূত্রপাত ধরা হয় বৈদিক যুগ থুকে ( আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে প্রায় ৬০০-৫০০ খ্রিস্টপূর্ব )।

প্রথমদিকে বেদ ছিল শ্রুতিনির্ভর পরবর্তী অনেক কাল পরে বেদ লিখিত হয়। তারপর রামায়ণ, মহাভারত, হরিবংশ পুরাণ, কালিদাসের কাব্যনাটক ইত্যাদিতে নৃত্যের বহু উপাদান ছড়িয়ে আছে। এছাড়া পরে পাওয়া যায় ভারতের শাস্ত্রীয় নৃত্যগুলির পান্ডুলিপি।

 

একজন মহিলা ভরতনাট্যম নৃত্যশিল্পী [ A female Bharatanatyam dancer ]
একজন মহিলা ভরতনাট্যম নৃত্যশিল্পী [ A female Bharatanatyam dancer ]

জীবন্তধারার বিশ্লেষণ করতে গেলে মোটামুটিভাবে তিনটি সমাজের চিত্র বেরিয়ে আসে। ১. আদিবাসী নৃত্যে আদিবাসী বা উপজাতীয় সমাজের চিত্র; ২. লোকনৃত্যে গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক গণসমাজের চিত্র; ৩. উচ্চাঙ্গ নৃত্যে নগরকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজের ভাবনাচিন্তা প্রকাশের চিত্র।

জীবন্তধারা ও মৃতধারা, এই নিয়ে আর বিশদ আলোচনায় গেলাম না।

 

একটি কুচিপুড়ি নাচ চলছে [ A Kuchipudi dance in progress ]
একটি কুচিপুড়ি নাচ চলছে [ A Kuchipudi dance in progress ]

নৃত্যকলার উৎপত্তি বিষয়ে যত মতবাদ প্রচলিত আছে তার বিশ্লেষণে নিম্নলিখিত দুটি মতবাদকেই প্রামাণ্য বলে ধরা হয় :

১. সাহিত্যগত মতবাদ ( ভাববাদী ব্যাখ্যা )
২. নৃতত্ত্ব বা প্রত্নতাত্ত্বিক মতবাদ ( বস্ত্তবাদী ব্যাখ্যা )

ক. আদিম মানুষ ব্যক্তি এবং সমাজকে দৈবদুর্বিপাক থেকে রক্ষার উপায় হিসাবে ঐন্দ্রজালিক যাদুক্রিয়ার অঙ্গরূপে নৃত্যের উদ্ভাবন করেছিল। তাদের মতে সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আদিম সমাজ হতে উদ্ভূত এই ক্রিয়া পরিত্যক্ত না হয়ে বরং নানা দিক হতে শিল্প ও সৌন্দর্যবোধের দ্বারা যুগোচিত পরিমার্জনা লাভ করে। এর ধারা অত্যন্ত প্রাচীন, মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আদিম যুগে শিল্পের উৎপত্তি ও শিল্পসৃষ্টির প্রসঙ্গে যাদুবিদ্যার প্রভাব ও প্রেরণার বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রখ্যাত কলা সমালোচক Ernst Fisher বলেছেন—-

we may conclude from a constantly growing wealth of evidence that Art in its origins was magic, a magic aid towards mastering a real but unexplored world, Religion, Science and Art were combined in a latent form-germinantly as it were -in-magic.

খ. ভাষাহীন আদিম মানুষ হাত-পা নেড়ে ভাবপ্রকাশের জন্য যে অঙ্গভঙ্গি করত তাই ধীর বিবর্তনের পথে নৃত্যের রূপ নেয়। জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ যে শুধু ছবিতেই অনুকৃতি করেছে তা নয়, মন্ত্র-তন্ত্রের সঙ্গে নাচে-গানে নানা অনুকৃতিমূলক কাজে জীবজন্তু, বৃক্ষ, লতাপাতা থেকে শুরু করে প্রকৃতির নানা ব্যবস্থাকে নিজেদের আয়ত্তে আনার চেষ্টা করেছে। ভারতে তো বটেই, প্রতিবেশী রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার বর্ণম নাচে এই অনুকৃতি চমৎকার পরিলক্ষিত হয়।

 

একজন পুরুষ ভরতনাট্যম নৃত্যশিল্পী একটি অভিব্যক্তি তৈরি করছেন [ A male Bharatanatyam dancer making an expression ]
একজন পুরুষ ভরতনাট্যম নৃত্যশিল্পী একটি অভিব্যক্তি তৈরি করছেন [ A male Bharatanatyam dancer making an expression ]

গ. আদিম মানুষের কায়িক পরিশ্রমের সঙ্গে যে অঙ্গবিক্ষেপ যুক্ত ছিল তাই ক্রমে নৃত্যের রূপ ধারণ করে। শ্রমকে লাঘব করার জন্য নৃত্যের ব্যবহার পূর্বের ন্যায় আজও আছে। প্রসঙ্গত উদাহরণস্বরূপ বলা যায়–ছাদ পেটানোর গান, নলকূপ বসানোর গান, মাঝিমাল্লার গান ইত্যাদি, অর্থাৎ কোনও শ্রমসাধ্য কাজ করবার সময় যে যৌথ সঙ্গীত। নৃতাত্ত্বিক তথ্যে আমরা পাই আদিম যুগে সব শিল্পকলাই মানুষের জীবিকা তথা খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত।

যদিও আজকে আমরা নাচ-গান-কবিতা-ত্রিবিধকলা প্রভৃতিকে আলাদা করে দেখতে অভ্যস্ত, কিনতু মনে রাখতে হবে আদিতে এইগুলি ছিল সম্পৃক্ত। এই প্রসঙ্গে George Thomson বলেছেন–

The three arts of dancing, music and poetry began as one. Their source was the rhythmical movements of the human bodies engaged in collective labour.

ঘ. যে শস্য মানুষের জীবনধারণের অবলম্বন, তার সুফলপ্রাপ্তি ও সুফলন এই দুই ক্ষেত্রেই নৃত্যের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। মানুষের কামনা আকাঙ্ক্ষা থেকেও নৃত্যের জন্ম হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়—-বৈদিক যুগে যজ্ঞকুন্ডের চারিদিকে মহাব্রত অনুষ্ঠান, আধুনিক যুগে আমরা পাই নৈলাব্রত, ক্ষেত্রব্রত, নবান্ন উৎসব। দেবতার উদ্দেশ্যে কৃষক ও তাদের পরিবারের লোকজন মাঠে নৃত্য করে। আদিম মানুষ রৌদ্র, বৃষ্টি, বাতাসের অনুকরণে নাচত দেহভঙ্গির সাহায্য নিয়ে। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা বাড়ে আশা করা যায়। এই প্রসঙ্গে George Thomson বলেছেন—

It is not possible that potatoes will directly influenced by this dance but it must influenced the dancers themselves. At least they believed that their dance has something to do with groth of the plants.

ঙ. নরনারীর মিলনের নানা রূপ কালক্রমে ক্রমবির্বতনের পথে মানুষের এই সহজাত প্রবৃত্তি থেকে জন্ম নেয় নানারূপ শৈল্পিক ভঙ্গিমা—যার প্রচুর নিদর্শন আমাদের মন্দিরগাত্রে বিদ্যমান। যা মানুষের শিল্প চেতনার মধ্যে বর্তমান।

 

ভারতের পাঞ্জাবের ভাংড়া নৃত্যশিল্পী [ Bhangra dancers in Punjab, India ]
ভারতের পাঞ্জাবের ভাংড়া নৃত্যশিল্পী [ Bhangra dancers in Punjab, India ]

যাদুবিশ্বাস বলতে আমরা বুঝি, অজ্ঞতা, ভয় আর বিস্ময় থেকে আদিম মানুষ প্রকৃতির শক্তিগুলিকে নিজেদের ভাগ্যবিধাতা বা দেবতা বলে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করত। এই সন্তুষ্ট করার প্রাচীন কৌশল হল যাদু বা ম্যাজিক। যাদুর ননিয়ম-নীতি ও সংযমের মধ্য দিয়ে মানুষের দৈহিক ও মানসিক শক্তির উদ্ভাবন ও অনুশীলন হতো। ফলে মানুষ সত্যি মৃগয়ায় মনঃসংযোগের ফলে জীবিকার যুদ্ধে ক্ষিপ্রতর, কুশলতর ও বিচক্ষণ হয়ে উঠত। তাই, জীবিকা চর্চা হিসাবে নাচ, গান, চিত্র, নানা রীতিনীতি গড়ে ওঠে যাদু বা ম্যাজিকের আশ্রয়ে।

আদিম সমাজে যাদুবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে কীভাবে এই যাদুবিশ্বাস থেকে ধীরে ধীরে ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান ও দেবদেবীর কাহিনি গড়ে উঠেছে তার বিবর্তনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, যেসকল পৌরাণিক কাহিনিকে কেন্দ্র করে নাচের উৎপত্তি দেখানো হয়েছে তার অনেক আগেই জীবিকার প্রয়োজনে নাচের উৎপত্তি হয়েছে।

 

নৃত্যের অভিব্যক্তিপূর্ণ পর্যায়ে একজন ওড়িশি নৃত্যশিল্পী [ An Odissi dancer in nritya (expressive) stage of the dance ]
নৃত্যের অভিব্যক্তিপূর্ণ পর্যায়ে একজন ওড়িশি নৃত্যশিল্পী [ An Odissi dancer in nritya (expressive) stage of the dance ]

নৃতাত্ত্বিক তথ্যে প্রগৈতিহাসিক যুগে মানুষের সামাজিক ও আর্থিক কাঠামো হিসাবে যা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে তার উপর ভিত্তি করেই নৃত্যের উৎপত্তি বিষয়ে দুটি উপপাদ্যে উপনীত হওয়া গেছে। এই উপপাদ্য দুটি হল:~
১. নৃত্যের উৎপত্তির মূল ছিল অনুকরণমূলক যাদুবিশ্বাস (Initiative Magic)
২. আদিতে তা খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত ছিল। আর এই নৃত্যের আঙ্গিকে থাকত সমষ্টিচেতনার স্ফুরণ (Collective Emotions)।

Sir James Frazer তাঁর ‘ Golden Bough’ গ্রন্থতে যাদু সম্বন্ধে বলেছেন—

The control of supernatural forces by means of compulsive formulas in known as magic.

জীবিকা ছাড়াও বাঁচার তাগিদে আদিম মানুষ নানারূপ যাদুতে বিশ্বাস করত। যেমন রৌদ্র, বৃষ্টি, বজ্র, ভূমিকম্প ইত্যাদি নানারূপ প্রকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবার জন্য তারা এইসব বিপর্যয়কে অলৌকিক জ্ঞানে অনুকরণমূলক নৃত্য করত। একেই বলা হয় অনুকরণমূলক যাদুবিশ্বাস। প্রকৃতির শস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এই কথাই প্রযোজ্য। এইসব নৃত্য নানা লোকাচারের মধ্যে দিয়ে নানারূপ ধারণ করে।

 

ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ৭ [ Bharatnatyam Hasthamudra 7 ]
ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ৭ [ Bharatnatyam Hasthamudra 7 ]

এবার আসি সাহিত্যগত উপাদান বা ভাববাদী মতবাদে। নাচের উৎস সন্ধানে এতদিন ধরে শুধুমাত্র সাহিত্যগত উপাদানের ভিত্তিতেই কিংবদন্তীকেন্দ্রিক পৌরাণিক কাহিনিগুলি প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। এর ফলে কিছু ক্ষতিও হয়েছে। এই প্রসঙ্গে Dr. V. K. Narayan Menon বলেছেন—-

” ……most historical studies degenerate into a mixture of pseudo -legendary and mythology with large doses of sentimentality and platitudes”

ভাববাদীদের মতে নটরাজই নৃত্যের প্রথম উদ্ভাবক। ব্রহ্মা চারটি বেদ থেকে সারাংশ গ্রহণ করে একটি নতুন বেদের সৃষ্টি করেন। এই বেদই “পঞ্চম বেদ” বা “নাট্যবেদ” নামে পরিচিত।

ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ৮ [ Bharatnatyam Hasthamudra 8 ]
ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ৮ [ Bharatnatyam Hasthamudra 8 ]

ভারতীয় নৃত্যের প্রামাণ্য দলিল ভরতের ‘নাট্যশাস্ত্র’ ও অনুসারী গ্রন্থ নান্দীকেশ্বরের ‘অভিনয় দর্পণ’। এই গ্রন্থে নৃত্যের উৎপত্তি আধ্যাত্মিকতার উপর বিদ্যমান সংক্ষেপে গ্রন্থটি হল ——-ভগবান ব্রহ্মা অন্ত্যজ শ্রেণির লোকেদের শিক্ষার জন্য নাট্যবেদ সৃষ্টি করেন এবং এর প্রয়োগের দায়িত্ব দেন ভরতমুণিকে। ভরতমুণি গন্ধর্ব ও অপ্সারাদের দিয়ে নৃত্য ও নাট্য মহাদেবের সামনে প্রদর্শন করেন। তখন মহাদেব শিষ্য তন্ডুকে তান্ডব নৃত্যের শিক্ষা দেন এবং পার্বতী বাণরাজের কন্যা ঊষাকে লাস্য নৃত্যের শিক্ষা দেন। ক্রমে দ্বারকা ও সৌরাষ্ট্রের রমনীরাও ওই নৃত্য শিক্ষা করেন। এইভাবে মর্ত্যে নৃত্যের প্রচার হয়। নাট্যোৎপত্তি প্রসঙ্গে ‘অভিনয়দর্পণ-এ আছে—-‘ নাট্যং, নৃত্যং তথা নৃত্যমগ্রে শম্ভো প্রযুক্তবান।’ নাট্যবেদ এমনই একটি নাট্য রচিত হল যা হিতোপদেশ পূর্ণ। এই নাট্য দৃষ্ট হবে না এমন বিদ্যা নেই, এমন কলা নেই, এমন যোগ নেই, এমন কর্মই নেই।

 

ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ১১ [ Bharatnatyam Hasthamudra 11 ]
ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ১১ [ Bharatnatyam Hasthamudra 11 ]

নৃত্যের কাহিনকাহিনিগুলিই একমাত্র উপাদান নয়। কারণ কিংবদন্তী কখনও পুরোপুরি ইতিহাস চেতনার ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। যদিও আমরা জানি, কিংবদন্তী, পৌরাণিক কাহিনির মধ্যে ইতিহাসের অনেক উপাদান সুপ্ত অবস্থায় আছে। সাহিত্যগত উপাদানের ভিত্তিতে নাচের উৎপত্তির মধ্যে সর্বত্রই প্রায় ঐশী শক্তির প্রাধান্য। নৃতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানে নৃত্যের উৎস সন্ধানের পার্থক্য এখানেই। মানুষের সমাজে, সংস্কৃতিতে পরিবর্তন হয় মূলত সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। বৈদিক যুগে মানুষ গ্রাম্য জীবন থেকে উন্নততর ছন্দোময় জীবনে উন্নীত হয়েছে।

কৃষিভিত্তিক সমাজের শ্রেণিভেদ ও অর্থনৈতিক অসাম্য ক্রমশ দানা বেঁধে উঠেছে। সমষ্টি চিন্তা ব্যক্তিচিন্তার রূপ নিচ্ছে। মানুষ ক্রমশ অদৃষ্টবাদী হয়ে উঠেছে। মানুষের মধ্যে মানুষ দেবত্বের ছায়া কল্পনা করেছে। দেবতাকেন্দ্রিক রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ কাহিনি তৈরি হয়েছে। ধ্রুপদী নাচগুলির মধ্যে আজও পুরাণ কাহিনি নিয়ে নৃত্য নির্মাণ হয়ে চলেছে। ঐশীশক্তির বক্তব্য পুরোপুরি ঐতিহাসিক তথ্য সম্বলিত না হলেও ওই বক্তব্যের মধ্যে সেইসময়কার সমাজের চিত্র পাওয়া যায়।

এই চিত্রের মধ্যেই পাই ভারতীয় নৃত্যের ধর্মীয় ভাব, আধ্যাত্মিকতা, প্রতীকধর্মিতা ও নান্দনিকতা। সেইসময়ের ওই ঐশ্বর্যপূর্ণ নৃত্যকলাকে মানুষ ভাবে ভগবানের সৃষ্টি। কিনতু একটু অনুধাবন করলেই পরিষ্কার হয় যে ভগবানের রূপ তো মানুষেরই কল্পনা।

ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ১৮ [ Bharatnatyam Hasthamudra 18 ]
ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ১৮ [ Bharatnatyam Hasthamudra 18 ]
মানুষই তার রূপের আবিষ্কারক। এখানে আদিম সমাজের নৃত্য প্রসঙ্গে অ্যারিস্টটলের বক্তব্যটি খুবই সুদূরপ্রসারী। তিনি বলেছেন,

In dancing rhythm alone is used without Harmony ‘ for even dancing imitates character, emotion and action by rhythmical movement.

. নৃত্য—দেহের ছন্দে ‘ক্রিয়া, আবেগ ও চরিত্রের অনুকরন’। নৃত্যের উপস্থাপ্য হচ্ছে—–চরিত্র, আবেগ ও ক্রিয়া এবং মাধ্যম বা উপাদান পদ্ধতি হচ্ছে ‘গাত্রবিক্ষেপ’। অ্যরিস্টটলের এই বক্তব্যকে অনেকেই ভাববাদী দৃষ্টিতে দেখতে অভ্যস্ত। তবুও বলা যায়, অন্য একটি দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বক্তব্যকে বিচার করা যেতে পারে। বস্তুবাদী ও ভাববাদী ব্যাখ্যার মধ্যে সেতুবন্ধন বা যোগসূত্র হিসাবেও ধরা যেতে পারে।

১. চরিত্রের অনুকরণ———-যাদুবিশ্বাসমূলক অনুকরণ। অনুকৃতিমূলক কাজ (mimesis)

২. আবেগ———-শুধু ব্যক্তিগত নয়, সমষ্টিগত আবেগ হিসাবে ধরা যেতে পারে (Collective emotion)

৩. ক্রিয়া———-গোষ্ঠীবদ্ধ আদিম মানুষের কাছে কাজ ও নাচ প্রায় সমার্থক ক্রিয়া রূপে ছিল।

বিহু নৃত্য [ Bihu dance ]
বিহু নৃত্য [ Bihu dance ]
ক্রমবিবর্তনের ইতিহাসের আনুপূর্বিক বিশ্লেষণ থেকে আমরা সিদ্ধান্তে আসি যে প্রাণের উৎস প্রোটোপ্লাজমের যুগেও তাদের মধ্যে একটা ছন্দ ছিল। ক্রমশ বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রাণিদেহের মধ্যেও সেই ছন্দ চলে আসে। ক্রমে মানবদেহের মধ্যেও তা সঞ্চারিত হয়। এই ছন্দ থেকই নৃত্যের উদ্ভব। আত্মরক্ষার তাগিদে মানুষ পশুপাখির গতিবিধি নিরীক্ষণ করে নিজেদের গতি নিরূপণ করত। বোধহয় এই-ই সূত্রপাত শিকারিনৃত্যের। এই দিক দিয়ে এই নৃত্যকে আমরা আদি নৃত্য বলতে পারি।

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন