মণিপুরী নৃত্যে দুটি ধারা দেবযানী চলিহা

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় মণিপুরী নৃত্যে দুটি ধারা দেবযানী চলিহা , যা ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্য এর অন্তর্ভুক্ত।

মণিপুরী নৃত্যে দুটি ধারা দেবযানী চলিহা

গন্ধর্বরাজ চিত্ররাহনের কন্যা চিত্রাঙ্গদা। নৃত্যগীত বিশারদ রাজা চিত্রাঙ্গদাকে মনের মতো করে বড় করলেন নিজে কন্যাকে নৃত্য গীত বাদ্য শেখালেন। চিত্রাঙ্গদা হয়ে উঠলেন নৃত্যগীতে সুনিপুণা। শিক্ষা শেষে চিত্রবাহন একটি সভার আয়োজন করলেন। তাতে নিমন্ত্রিত হলেন দেবদেবীরা, রাজা রাণীরা।

সেই সভায় কন্যা চিত্রাঙ্গদাকে সর্ব সমক্ষে নৃত্য পরিবেশন করতে বললেন। সদ্য মুকুলিত পুষ্পের মতো নব যৌবনা চিত্রঙ্গদা তার নৃত্য পরিবেশন করলেন। অভ্যাগত অতিথিরা মুগ্ধ নয়নে সে নৃত্য দেখে তাদের নয়ন সার্থক করলেন। কিন্তু একসময় হঠাৎ চিত্রাঙ্গদার তালভঙ্গ হলো- ক্রুদ্ধ পিতা চিত্রবাহন অপমানিত বোধ করলেন।

কন্যাকে অভিশাপ দিলেন- “তুই সাপ হয়ে বনে বনে ঘুরে বেড়াবি।” উপস্থিত সভাসদরা রাজাকে এ কঠিন অভিশাপ তুলে নিতে অনুরোধ করলেন। চিত্রবাহনের রাগ পড়ে গেলে তিনি বললেন-”যে অভিশাপ একবার মুখ থেকে নিঃসৃত হয়েছে তা তো আর ফেরানো যাবে না, তবে, অভিশাপ থেকে চিত্রাঙ্গদা মুক্তি পাবে যদি পশ্চিম দেশের কোনো ক্ষত্রিয় বীরের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়।”

সর্পিণীরূপী চিত্রাঙ্গদা বনে বনে ঘুরে বেড়ান। একদিন দ্বাদশবর্ষ বনবাসের ব্রতধারী অর্জুনের সঙ্গে তার দেখা হয় এবং তাতেই অভিশাপমুক্তি ঘটে। চিত্রাঙ্গদার এই কাহিনীটি মণিপুরের একটি প্রচলিত লোকগাথা । চিত্রাঙ্গদার এই উপাখ্যান থেকে অনুমান করা যায় যে মণিপুরে নৃত্যগীতের সমাদর পুরাকাল থেকেই চলে আসছে এবং সে ধারা আজও অব্যাহত।

 

মণিপুরী নৃত্যে দুটি ধারা দেবযানী চলিহা

 

নৃত্যগীত শুধুমাত্র আমোদ বা বিলাসিতার উপকরণ নয়। রাজা নিজে তার চর্চা করতেন, সে সম্মানিত আসনে প্রতিষ্ঠিত ছিল। পাটকাই পর্বতমালা পরিবেষ্টিত মণিপুর একটি উপত্যকা। নাগা, কুকী, মিজো ও তাদের অসংখ্য উপজাতি পার্বত্য এলাকায় বাস করে। প্রত্যেকের ভাষা আলাদা, জীবনধারা পৃথক । উপত্যকাভূমির অধিবাসী মৈতে জাতি, যাদের সাধারণত মণিপুরী বলা হয়।

তারা যে ভাষায় কথা বলে তা ভোট-বর্মী গোষ্ঠীর ভাষা মৈতৈ । পার্বত্য এলাকার বেশীর ভাগই খ্রীস্টীয় ধর্ম গ্রহণ করেছে, শুধু মৈতৈরা বৈষ্ণব ধর্মকে সম্পূর্ণ নিজের করে নিয়েছে। পাক-ঐতিহাসিক যুগ থেকে মৈতৈরা, অন্যান্য সব জাতির মতো বনদেবতা, বনদেবীর পূজা করে আসছে। নংপোক নিংথৌ-পানথৈবী, ইবুধৌ থাংজিং-লাইরেম্বী ইত্যাদি নামে এই দেবতারা খ্যাত।

বনদেবতা আরাধনার কেন্দ্রস্থল মৈরাং। চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা মাঝখানে স্ফটিক স্বচ্ছ জলের বিশাল হ্রদ লোকতাক- এপার ওপার দেখা যায় না। সেই লোকতাক হ্রদের ধারে মৈরাং পুরাকালে মৈতৈ সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল ছিল। লোকতাক হ্রদে ছোটো ছোটো ডিঙি নৌকায় ছেলে মেয়েরা যাত্রী ও পারাপার করে এবং গান করে।

সে গান পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে অপূর্ব সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করে। মৈবাং ও লোকতাককে ঘিরে মণিপুরে লোকগাথার শেষ নেই- মৈরাং পর্ব মৈতৈদের অতি প্রিয় লোককাহিনী। ঐতিহাসিক ভিত্তিতে রচিত এ কাহিনীটি খাম্বা ও থৈবীর প্রেমকে অমর করে রেখেছে। রাজকুমারী থৈবী ও সুদর্শন কৃষক যুবক খাম্বা প্রণয়সূত্রে আবদ্ধ হলেন। রাজ বংশজাত নয় বলে খাম্বা অনাদৃত।

অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে প্রেম জয়ী হলো। কিন্তু রোমিও জুলিয়েটের মতো খাম্বা ও থৈবীও মৃত্যুকে তাঁদের মিলন সাথী করে নিলেন। বনদেবতার পূজা করা হয় লাই হারাওবা উৎসবের মাধ্যমে। লাই অর্থাৎ দেবতা ও হারাওবা অর্থাৎ আনন্দ। দেবতাদের এই আনন্দ উৎসবে পৌরোহিত্য করেন মহিলা পুরোহিত মাইবী ও পুরুষ পুরোহিত মাইবারা।

মাইবারা কিন্তু মাইবীদের মতোই পোশাক পরেন- সাদা ফনেক (নিম্নাঙ্গের আবরণ) ও বিশেষ ধরনের পার দেওয়া সাদা ইনেফী (চাদর) । লাই হারাওবাতে পেনা নামক, ছড় দিয়ে বাজানো একটি প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয়। ছড়ের সঙ্গে লাগানো থাকে ঘুঙুর- তালবাদ্যের কাজও করে তা। লাই হারাওবা শুরু হয় লাই পুং অর্থাৎ দেবতাকে জাগ্রত করা ক্রিয়া দিয়ে।

মাইবা পেনা বাজান, মাইবী তার তালে তালে জলাশয়ে নিমজ্জিত দেবতাকে জাগ্রত করেন ও দৈবাবিষ্ট হয়ে সেই দেবতাকে নিয়ে আসেন ও তাঁর নৃত্য পূজা শুরু করেন। নৃত্য পূজার মাধ্যমে মাইবী সৃষ্টিতত্ত্বের বিবরণ দেন। পৃথিবীর সৃষ্টি, মানুষের সৃষ্টি। মানুষের ব্যবহারের জন্য গৃহনির্মাণ, কাপড় বোনা ইত্যাদির বর্ণনা করেন। এ নৃত্য কঠিন নিয়মানুগ। অতি গোপন ও জটিল এর তথ্য।

শুধু মাইবীরাই গুরু পরম্পরা হিসাবে এ শিক্ষা পেতে পারেন। নৃত্য প্রসঙ্গে মাইবীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাইবীর সৃষ্ট নৃত্যই মণিপুরী ধ্রুপদী নৃত্যের অঙ্কুর বিশেষ। নানাপ্রকার লৌকিক হস্তমুদ্রা তাঁরা ব্যবহার করেন। তান্ত্রিক হস্তমুদ্রার সঙ্গে এদের সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। মাইবী নৃত্য পরিশোধিত ও পরিমার্জিত হয়ে পরে ধ্রুপদী নৃত্যে পরিণত হয়েছে।

লাই হারাওবা উৎসব আজও মহাসমরোহে পালিত হয়। মন্দির চত্বরে, খোলা মাঠে এ উৎসব পনেরো দিনব্যাপী চলে। সেখানে মাইবীদের নৃত্য পূজাকে কেন্দ্র করে শতাধিক ছেলে মেয়ে নিজেদের দেবতা মনে করে নাচতে নাচতে আরাধ্য দেবতার সঙ্গে এক হয়ে যায় । খাম্বা থৈবীর প্রেম কাহিনী স্মরণ করে খাম্বা-থৈবী নৃত্য অর্ঘ্য দেবতার কাছে নিবেদন করে।

মেয়েরা নাচে লৈমা জাগোই-কুমারী নৃত্য। সে নৃত্যে শরীর আন্দোলিত হয় মৃদু হাওয়ায় সুপুরি গাছ যেমন নড়ে, সমুদ্রের ঢেউ যেমন একটার সঙ্গে অন্যটা মিশে যায়। মাইবীর নৃত্য কঠিন নিয়মে বাঁধা। পূজা রীতির মতোই এ নৃত্যধারা অপরিবর্তনীয়। কিভাবে হাত যাবে, শরীর বেঁকবে, কবার কোনদিকে ফিরতে হবে— সব নির্ধারিত।

এ নৃত্য যদিও লোকনৃত্য বলে বিবেচিত, ধ্রুপদী নৃত্যের শৃঙ্খলা এতে পুরো মাত্রায় পাওয়া যায়। পুরাকালে মাইবীরা শুধু পুরোহিতই ছিলেন না। তারা একাধারে বাদ্য, জ্যোতিষ সব- ঐহিক ও পারলৌকিক সব বিষয়ে উপদেষ্টা ছিলেন। এখনকার সমাজে ডাক্তার বদ্যি থাকলেও মৈতৈদের জীবনধারায় মাইবীর ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। মণিপুরে সবচেয়ে বড় উৎসব য়শাং- হোলি।

হোলির সময় ছেলেমেয়েরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে সারা রাত ধরে নাচে থাবাল চোংবা। থাবাল অর্থাৎ পূর্ণচন্দ্র ও চোংবা মানে লাফানো। চাঁদের আলোয় লাফিয়ে লাফিয়ে নাচ- এ উৎসব একমাস ধরে চলে। খোলা মাঠে নইলে কারো বাড়ির বড় উঠানে, ঢোলকের বাজনা ও গানের সঙ্গে আনন্দ নৃত্য করে ছেলেমেয়েরা সারা রাত ধরে।

আনুষঙ্গিক লোকগীতে থাকে খাম্বা থৈবী প্রমুখ বিভিন্ন প্রেম কাহিনীর বর্ণনা। সে প্রেম কাহিনীর অনুপ্রেরণায় এ সময় অনেক ছেলেমেয়ে পালিয়ে গিয়ে গান্ধর্ব বিবাহ করে। লাই হারাওবা গোষ্ঠীর নৃত্য ছাড়া মণিপুরে আরও একটি ধারা আলোচনার দাবি রাখে তা হলো যুযুৎসু কলা- তমুখনা ও তাং তা জাগোই। বিনা অস্ত্রে আত্মরক্ষার কলা তমুখনা ।

থাং অর্থে তরোয়াল ও তা অর্থে বর্শা। তরোয়াল নিয়ে যুদ্ধের ভঙ্গিমায় রচিত এ নৃত্যকলা শুধু পুরুষরাই করে। থাং জাগোই— তরোয়াল নৃত্য ভয়াবহ রূপ নেয় যখন একজনের বুকের ওপর আস্ত লাউ রেখে অন্যজন চোখ বাঁধা অবস্থায় সে লাউ দু টুকরো করে কাটে। এ নৃত্যের পদগতি ও মাত্রা গাণিতিক ছকে বাঁধা। এর তালিম শুধু থাং-এর গুরুই দিতে পারেন।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এ নৃত্য খুব সমাদর লাভ করেছে। তা জাগোই অর্থাৎ বর্শা নৃত্যর পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা। বনে শিকার করতে গিয়ে বর্শার সাহায্যে কিভাবে জঙ্গল পরিষ্কার করা হয় ও পরে শিকার করার জন্য কিভাবে তা ব্যবহার করা হয়, তার ভিত্তিতে রচিত এ নাচ শুধুমাত্র পুরুষরাই করে ।

এ ছাড়া মণিপুরে আছে পার্বত্য এলাকার অসংখ্য উপজাতিদের নিজেদের লোকনৃত্যসম্ভার। তাদের পোশাক, শিরাভরণ ও নৃত্যবৈচিত্র্য মনেক অভিভূত করে দেয়। এতক্ষণ যা আলোচিত হল সবাই পাক ঐতিহাসিক যুগ থেকে মণিপুরবাসীদের জীবনধারার সঙ্গে মিশে আছে ৷ কালের স্রোতে তারা বিলীন হয়ে যায়নি।

মণিপুরের লোকনৃত্য সম্ভারে তারা আজও সমান মর্যাদায় বিরাজ করছে। লাই হারাওবা আজও গ্রামেগঞ্জে, শহরে অনুষ্ঠিত হয়। সমান উৎসাহে থাবাল চোংবা হয় সারারাত। থাং তা আবার নতুন উদ্যম পেয়েছে। মৈবাং-এ লাই-হারাওবা এখনও অনুষ্ঠিত হয় মৈরাং-হারাওবা নামে।

যদিও আধুনিক যুগের ছোঁয়া লেগে অনেক ছেলেমেয়ে পপ্ গানসহ আধুনিক জীবনধারায় আকৃষ্ট হয়েছে, তবু এসব পুরোনো ঐতিহ্য এখনও বেঁচে আছে। মণিপুরের ঐতিহ্য মূলতঃ ভারত-মোঙ্গলীয়, যদিও ইতিহাসের ধারায় তা আর্য ও দ্রাবিড় সভ্যতার সঙ্গে মিশে একটি নিজস্ব রূপ নিয়েছে।

যে তান্ত্রিক সূত্রটি কাশ্মীর থেকে শুরু করে নেপাল, ভূটান, কামরূপ ও বঙ্গদেশে ছড়িয়ে পড়েছে তার রেশ মণিপুরে স্পষ্ট। লাই হারাওবাতে পূরাণ-তান্ত্রিক সংস্কৃতিক প্রভাব লক্ষ্যণীয়। মাইবীর পূজারীতিতে তান্ত্রিক সাধনার আভাস পাওয়া যায় ৷ ভোট-বর্মী ভাষাভিত্তিক মৈতৈ ভাষা সংস্কৃতভিত্তিক ভাষার চেয়ে ভিন্ন।

আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে, মধ্যযুগে মণিপুরে ক্যাম্বা নামে এক রাজা ছিলেন (খ্রীস্টাব্দ ১৪৬৭-১৫০৪)। পংদের নৃপতি কেখোম্বা বন্ধু ক্যাম্বকে সোনার বাটায় উপহার দিলেন একটি সোনার বিষ্ণুমূর্তি। অতি আদরের এ দুটি উপহার রাজা ক্যাম্বা যত্নসহকারে রাখতেন। একদিন রাজার শরীরে অস্বস্তি হওয়াতে তিনি সেই বিষ্ণু মূর্তিটি দিয়ে শরীর চুলকে ছিলেন।

অমনি তাঁর শরীর ফুলে গেল এবং চুলকানি অসম্ভব বেড়ে গেল। রাজকোষের কোনো ওষুধেই তার উপশম করা গেল না। অবশেষে রাজ পুরোহিত শিরোমণি মাইবী হাঞ্জাবীকে ডাকা হলো। তিনি দৈবাবিষ্ট হয়ে নৃত্যপূজা শুরু করলেন; দৈবাদেশ পেলেন “এ রোগ সারবে যদি সোনার বিষ্ণুমূর্তিটি কোনো ব্রাহ্মণ এসে পূজা করেন।”

তৈরি হলো মন্দির, বিষ্ণুমূর্তিটি তাতে স্থাপন করা হলো। (বিষ্ণুপুর নামে এক গ্রামে এই মন্দিরটি এখনও আছে) মন্দিরের ভার দেওয়া হলো ভবানীনাথ নামে এক ব্রাহ্মণকে। এই ভবানীনাথ মণিপুরে এসেছিলেন ভাগ্যান্বেষণে। ভবানীনাথ ছিলেন শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত খ্যাতিসম্পন্ন স্বনামধন্য রঘুনাথ ছিলেন ভট্টাচার্যের জ্যেষ্ঠ পুত্র। হয়গ্রীব ছিলেন তাঁদের ইষ্টদেবতা।

সেই সুবাদে বিষ্ণু আরাধনার সব রীতি তাঁর জানা ছিল। কিন্তু ভবানীনাথ স্থান কাল পাত্র বিবেচনা করে একটি সরল ও সুন্দর উপাসনা রীতির প্রবর্তন করলেন। ফল ফুল ও নৈবদ্য অর্পণ, বিষ্ণুর স্তোত্র পাঠ, বিষ্ণুর সহস্র নাম ও কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ থেকে দশাবতার স্তোত্র কীর্তন— এই ছিল পূজার উপকরণ। ঘন্টার অভাবে দু খণ্ড লোহা দিয়ে শব্দ করা হতো।

সে সময় বঙ্গদেশের কয়েকজন কীর্তনীয়া মণিপুরে এসেছিলেন। মন্দির পেয়ে তারা মহা খুশি। সন্ধ্যা আরতির সময় মন্দিরে এসে তারা কীর্তনের সঙ্গে সঙ্গত করার জন্য রাজা উপহার দিলেন একটি পুং অর্থাৎ মৃদঙ্গ। এই পুং তৈরি হয়েছিল রাজ দরবারে ব্যবহৃত খুনবুং বাদ্যযন্ত্র ও বাংলার মাটির খোলোর সংমিশ্রণের- একটি অভিনব আবিষ্কার।

কীর্তন জমে উঠল পুং-এর সহযোগিতায়। সঙ্গে লোহার ঘন্টা তো ছিলই। বিষ্ণুর উপাসনার জন্য এভাবে একটি নতুন কীর্তন ধারার সূত্রপাত হলো । রাজার পৃষ্ঠাপোষকতায় বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার ও প্রসার বাড়তে লাগল। ভক্তরা দূর দেশ থেকে আসতে লাগলেন, নিজেদের কীর্তনের ধারা প্রবর্তন করতে লাগলেন, নতুন গীত রচনা করতে লাগলেন।

বৈষ্ণব ধর্মের জোয়ারে মৈতৈভূমি মেতে উঠল। সে প্লাবন যুবক যুবতীদেরও আকৃষ্ট করল। তারা নিজেদের বৈষ্ণব বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করল। বৈষ্ণব ধর্মকে তারা আপন করে নিল । ঝাঁঝ ও মৈবুং অর্থাৎ শঙ্খ আনলেন কৃষ্ণভক্ত নিমাত্তী ব্রাহ্মণ বনমালী রায় ।

তার প্রভাবেই নৃপতি তুবিচরাইরোঙবা তৈরি করলেন মদন মোহনের মন্দির ও একটি কীর্তনীয়া দলকে ভরণ- পোষণ করার দায়িত্ব নিলেন। মণিপুরে কীর্তন প্রকৃতপক্ষে প্রতিষ্ঠিত হলো এই সময়েই। পরবর্তী পালা কীর্তনের সূত্রপাত এখানেই। মৈতৈরা স্বভাবত সৃজনশীল। কীর্তনের প্রবর্তন হবার সঙ্গে সঙ্গে অনেক নতুন গীত, তাল ও রাগ সৃষ্টি করলেন গুরুরা।

মহারাজ গরীব নিবাসের আমলে (১৭০৯-১৭৪৮খ্রীঃ), বঙ্গীয় পালা কীর্তনের আদলে, দেশী সংগীত ধারার মিশ্রণে তৈরি হলো বঙ্গদেশ পালা। মহাজন পদাবলী থেকে গীত নিয়ে, দেশী সুরের সঙ্গে মিশিয়ে একটি নতুন ধারার উদ্ভব হলো। করতালও এ সময় এল, তবে একে বলা হতো রামতাল। পরে এ করতাল সঙ্গীতোপযোগী করে তৈরি হলো মৈতৈ করতাল।

বঙ্গদেশ বা অরীবা পালা এখনও রাজবাড়ীতে গাওয়া হয়। এর নিগূঢ় তত্ত্ব মুষ্টিমেয় কয়েকজন গুরু শুধু এখনও জানেন । বঙ্গদেশ থেকে যাঁরা এসেছিলেন তারাও মৈতৈ দেশী সংগীতকে নিজের করে নিয়ে নতুন ধাঁচে সংগীত সৃষ্টি করলেন- সেই গুরুদের মধ্যে রাধা, রূপ ও শ্যামার নাম অন্যতম। বঙ্গদেশ পালা মণিপুরে এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে রাজন্যবর্গও এ কীর্তনের তালিম নিতেন।

এভাবেই শুরু হলো রাজর্ষি ভাগ্যচন্দ্রের রাধাভাব কীর্তন, এবং রাধাভাব কীর্তন থেকেই মণিপুরী রাস নৃত্যের শুরু হয়েছিল— ভক্তিভাব সম্ভূত নৃত্যকলার এ থেকেই সূত্রপাত । রাজর্ষি ভাগ্যচন্দ্র যখন রাজ সিংহাসনে বসলেন তখন গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম মৈতৈ ভূমির প্রান্তরে প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। মহারাজ দৈব আদেশ পেলেন যে কায়না পর্বতে একটি বিশেষ স্থানে কাঁঠাল গাছ আছে ।

সে গাছের কাঠ দিয়ে কৃষ্ণমূর্তি তৈরি করে মন্দিরে স্থাপন করতে হবে ও রাস নৃত্যপূজা করতে হবে। সে আদেশ সত্য প্রমাণিত হলো যখন নির্দিষ্ট স্থানে সত্যি কাঁঠাল গাছটি পাওয়া গেল । তা দিয়ে তৈরি হলো কৃষ্ণ মূর্তি, তৈরি হলো সে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য গোবিন্দজীর মন্দির (১৭৭৯খ্রীঃ) এই মন্দির আজও মণিপুরের প্রধান তীর্থ-স্থান।

রাজর্ষি ভাগ্যচন্দ্র প্রবর্তন করলেন রাস নৃত্যপূজার রীতি, পুং ও করতাল সহযোগে সঙ্কীর্তন সমারোহ- নট সঙ্কীর্তন। সে পূণ্য সঙ্কীর্তনে রাজর্ষি ভাগ্যচন্দ্র ছিলেন মুখ্য বাদক। তার খুল্লতাত শ্বেতসাই ছিলেন গায়ন ও শ্রীধরসাই দোহারের একজন। রাসে মহারাণী হীরামতি নিলেন গোপী প্রধানা মকোচিংবী ললিতার ভূমিকা এবং রাজকন্যা বিম্বাবতী হলেন রাসেশ্বরী রাধারাণী।

কৃষ্ণ ও রাধার ভূমিকায় পাঁচ বছর বয়সের ছেলে মেয়েকেই নেওয়া হয়। মনে করা হয় যে তার চেয়ে বড় হলে ঐশ্বরিক শক্তি তিরোহিত হয়ে যায়। এ প্রথা এখনও রাসে মেনে চলা হয়। ঐতিহাসিক এই সঙ্কীর্তন ছাড়াও রাস মণিপুরের উপাসনা রীতিতে এক যুগান্তকারী বিবর্তন এনে দিল । বঙ্গদেশ পালা, রাধাভাব সঙ্কীর্তন ছাড়াও নানা প্রকার কীর্তন রীতি এ সময় প্রচলিত ছিল।

সঙ্কীর্তন ও নাস পরিমার্জিত হয়ে উঠল সৃজনশীল গুরুদের রচনায়। গায়ক পদ্ধতি পরিবর্তিত হলো। পরিশোধিত হলো। দেশী গায়ন পদ্ধতির সংমিশ্রণে সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন স্টাইল তৈরি হয়ে গেল। প্রবাসী কীর্তন মৈতৈভূমিতে নবজন্ম লাভ করল। পরবর্তী রাজারা সঙ্কীর্তনের এই পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে উৎসাহ দান করেছেন।

রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় গুরুরা তাদের প্রতিভাকে প্রস্ফূটিত করেছেন, সৃষ্টি হয়েছে উচ্চমানের নৃত্য গীত। রাজর্ষি ভাগ্যচন্দ্রের তিরোভাবের একশ বছর পরে চন্দ্রকীর্তি মহারাজের আমলে (১৮৫০-১৮৮৬ খৃষ্টাব্দ) মণিপুরী সঙ্কীর্তনের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। চন্দ্রকীর্তি মহারাজ নিজে একজন চিন্তাশীল শিল্পী ছিলেন।

গুরুদের সাহায্যে তিনি নৃত্য গীত ও বাদ্যের আমোঘ সংমিশ্রণে সৃষ্টি করলেন অতি সুন্দর কীর্তন প্রণালী, পরিমার্জিত নৃত্য রীতি-ধ্রুপদী মণিপুরী নৃত্যের যবনিকা উন্মুক্ত হলো। রাস গোষ্ঠীর নৃত্যকেই শাস্ত্রীয় মণিপুরী নৃত্য বলা হয়।

মাইবী নৃত্যের ভিত্তিতে সৃষ্ট হলেও তা পরিমার্জিত ও পরিবর্দ্ধিত হয়ে সম্পূর্ণ একটি নতুন নৃত্যধারা উদ্ভূত হলো যা আজ আমরা ধ্রুপদী মণিপুরী নৃত্য হিসাবে পাই।

নট সঙ্কীর্তন, পাঁচটি রাস- কার্তিক পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত মহারাস, চৈত্র পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত বসন্তরাস, কুঞ্জরাস, দিবারাস ও নিত্যরাস, কৃষ্ণের বাল্যলীলার ওপর প্রতিষ্ঠিত গোষ্ঠলীলা ও উদূখল, চৈতন্য মহাপ্রভূর লীলার ওপর প্রতিষ্ঠিত গৌরলীলা- মণিপুরী ধ্রুপদী নৃত্য বলতে এদেরই বোঝায় । রাসলীলার শুরু হয় নট সঙ্কীর্তন দিয়ে।

গোবিন্দজীর মন্দিরের বিশাল মণ্ডপে, আরাধ্য দেবতার প্রতিমূর্তির সামনে ভক্ত শিল্পীরা পুং বাদন, করতাল চলম সহযোগে সঙ্কীর্তন করেন। মহারাজ চন্দ্রকীর্তি সিংহর আমল থেকে শৃঙ্কার রসের ৬৪ বিভাগকে ৬৪টি সঙ্কীর্তনের বৈঠকে বিস্তার করা হয়। মণিপুরী কীর্তন গায়ককে নট বলা হয়।

 

আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

সংস্কৃত শাস্ত্রে নট তাকেই বলে যে আঙ্গিক, বাচিক, আহার্য ও সাত্ত্বিক অভিনয়ে দক্ষ, নাট্য যার আয়ত্তে, যে রসাপ্লুত হয়ে নৃত্য গীতের মাধ্যমে দর্শককে কল্পলোকে নিয়ে যায়। বস্তুতপক্ষে মণিপুরী নট সঙ্কীর্তন বাংলার ঠাকুর নরোত্তম দাসের লীলা কীর্তনের ধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত বলা যায়। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য বন্দনা গৌড়চন্দ্রিকা দিয়ে শুরু হয়ে দীর্ঘ পাঁচ ঘন্টা ধরে চলে রাস সঙ্গীত।

সঞ্চার ও বিভিন্ন তাল প্রবন্ধ- তিন তাল, দুই-তাল, রাজমেল, একতাল- একটার পর একটা। এতে পুং ও করতাল চলমের বিভিন্ন গতি পরিবেশন করার যথেষ্ট সুযোগ থাকে। এই গতি সমূহ অতি মনোরম, শিল্পীসুলভ— শিল্পীর দক্ষতা এতেই প্রকাশ পায়। সঙ্কীর্তনে ব্যবহৃত তালসমূহ অতি সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপিত হয়।

উপস্থাপনা রাগ-রাগ আহৌবা- তার পরে ছন্দের ক্রমবিকাশ হয় ব্যাঘ্র বায়ু, বৃষ্টিছন্দ ইত্যাদি শরীরের ক্রমবিকাশের ধারাকে অনুসরণ করে। অবশেষে শরীর যখন সিদ্ধ স্তরে উপনীত হয়, তখনই শিল্পী সঙ্গীত পরিবেশন করার উপযোগী হয়।সঙ্কীর্তন শেষ হয় নিতাই পদ দিয়ে। নট সঙ্কীর্তনের এই ধারা এখনও বর্তমান।

বাংলা, মৈথিলী, ব্রজবুলি ও মৈতৈ কবিদের পদাবলী থেকে গীত গাওয়া হয়। ভক্তিরসাপ্লুত শিল্পী ও রসিক দর্শক ভাবাবেগে গদ গদ হয়ে আবেগাশ্রু সংবরণ করার প্রয়োজন বোধ করেন না। তাই রাস মণ্ডপে অবিরাম সাষ্টাঙ্গ প্রণামের জোয়ার চলে। প্রশংসা মুখর রসিকজন শিল্পীকে চাদর কিম্বা পারিতোষিক উৎসর্গ করে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে।

শিল্পী তাকে প্রতিপ্রণাম করেন আনন্দ বিসর্জন করতে করতে। বাংলার কীর্তন মৈতৈভূমিতে নবজন্ম লাভ করেছে। দেশী সঙ্গীতের সঙ্গে মিশে বাংলা কীর্তনের স্বরূপ এতই বদলে গেছে যে তাকে আর বাংলার কীর্তন বলে চেনা যায় না। তার নিজস্ব সত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সঙ্কীর্তনের পর শুরু হয় রাস।

সাধারণত রাসে কৃষ্ণ ও রাধার ভূমিকা দেওয়া হয় শিশু শিল্পীদের, যাদের বয়ঃসীমা পাঁচ বছর পার হয়নি, কেন না তার পরে শিশুর দৈবী শক্তি লোপ পায় এই ধারণা। প্রতিভা সম্পন্ন শিশু শিল্পীদের তালিম নিতে হয় দীর্ঘদিন। কৃষ্ণনর্তন, কৃষ্ণঅভিসার ইত্যাদি নৃত্য শিশুদের পক্ষে আয়ত্ত করা খুবই কষ্টকর। তবে প্রকৃত নাট্য, নৃত্য ও গীত পরিবেশন করেন গোপীরা যাঁরা রাধার সঙ্গে আসেন।

গোপী প্রধানা যাকে মকোকচিংবী বলা হয় তিনি নৃত্য-গীতের মাধ্যমে রাসলীলার ক্রমবিকাশ সাধিত করেন। সূত্রধারী ও অন্যান্য গোপীরা তাঁকে সাহায্য করেন। রাসলীলার কেন্দ্রবিন্দু ভঙ্গি পরেং অর্থাৎ নৃত্য মালিকা। ভঙ্গি পাঁচটি— ভঙ্গি অচৌবা অর্থাৎ বড় ভঙ্গি, গোপী বৃন্দাবন পরেং, খুরুম্ব পরেং অর্থাৎ প্রণাম নৃত্য মালিকা, গোষ্ঠ ভঙ্গি ও গোষ্ঠ বৃন্দাবন পরেং।

শেষের দুটি ভঙ্গি তাণ্ডবাঙ্গের। প্রথম তিনটি লাস্য অঙ্গের। মণিপুরী নৃত্যে লাসং ও তাণ্ডব এ দুটি ভাগ আছে। লাসং মেয়েদের মৃদু নৃত্য ও তাণ্ডব কৃষ্ণের নাচ। যদিও তাণ্ডব ও সুকুমার তাণ্ডব, উদ্ধত নয়। মূলত একই পদচালনা লাস্য ও তাণ্ডবের শুধু লাস্যে হবে মৃদু পদক্ষেপ, পা গোড়ালির বেশি উঠবে না ও তাণ্ডবে হাঁটু অব্দি পা উঠবে ও লাফানো পদগতি থাকবে।

পুং চলম ও করতাল চলমে তাণ্ডবাঙ্গের পদচালনা ব্যবহার হয়। কিন্তু এ তাণ্ডব কৃষ্ণের তাণ্ডবের চেয়ে পৃথক আঙ্গিকের। মণিপুরে বৈষ্ণব ভক্তরা মনে করেন যে ভঙ্গি এমন একটি নৃত্যশৈলী যার মাধ্যমে ভক্ত অন্তরের অন্তঃস্থলে তার আরাধ্য দেবতার প্রতিকৃতি রচনা করতে সক্ষম হয়। মহারাসে ভঙ্গি অচৌবা অর্থাৎ বড় ভঙ্গি শুরু হয় মধ্যরাত্রে।

যতক্ষণ ভঙ্গি নৃত্য চলবে, যে যেখানে আছে সেখানেই তাকে থাকতে হবে। নড়াচড়া করা চলবে না। দর্শকমণ্ডলীর মধ্যে ঘুমন্ত শিশুকে জাগিয়ে রাখা হয় যাতে হঠাৎ উঠে সে না কাঁদে। ভঙ্গি অচৌবা লাস্য নৃত্য, গোপীরা এ নৃত্যের মাধ্যমে কৃষ্ণের সঙ্গে একীভূত হবার প্রয়াস করেন। রাসলীলার মাধ্যমে ভক্ত-শিল্পীরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে আবেগ সূত্রে মিলিত হন।

বিশেষ করে ভঙ্গি এমন একটি নৃত্যকল্প যার ভাব দৃষ্টি ও ভাব মুদ্রা ভক্ত ও ভগবানের এ মিলনকে সম্ভব করে। এ নৃত্য দর্শকের জন্য নয়, এ নৃত্য শিল্পীর অন্তরের আকুতির নৃত্য। এ নৃত্যে হয়তো তেমন চটক নেই কিন্তু ভক্ত যখন এ নৃত্যের তাৎপর্য বোঝে তখন তা তাকে ঐশ্বরিক আনন্দ এনে দেয়।

মৈতৈভূমিতে বৈষ্ণব ধর্ম যখন এল, তখন থেকে লাই হারাওবার সঙ্গে সঙ্গে বৈষ্ণব ধর্মীয় উৎসব সমূহও মহা সমারোহে পালিত হতে লাগল। প্রত্যেকটি উৎসবে নৃত্য প্রাধান্য পেয়ে আসছে। রথ যাত্রায় রথের সঙ্গে চলার সময় হাততালি দিয়ে যে নাচ ও গান হয় তাকে বলা হয় খুবাক ইশৈ অর্থাৎ হাত তালি দিয়ে গান।

ঝুলনের সময় মন্দিরা বাজিয়ে মেয়েরা নাচে ও গায় নুপী পালা অর্থাৎ মেয়েদের পালা। তাছাড়া বিবাহ, শ্রাদ্ধ বা কর্ণচ্ছেদ অনুষ্ঠান সঙ্কীর্তন ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না। গোষ্ঠলীলা ও উদুখল কৃষ্ণের বাল্যলীলা ভিত্তিক উৎসব। এতে যশোদা, রোহিণী, নারদ মুনি, কংস ও নন্দরাজা ছাড়া সবই শিশু শিল্পী অংশ গ্রহণ করে।

সমসাময়িক মণিপুরে লাই হারাওবা ও রাস- এ দুই নৃত্যধারা সমান্তরালভাবে বিরাজ করছে। প্রাক বৈষ্ণব যুগীয় নৃত্যধারা লাই হারাওবা যার কেন্দ্রবিন্দু মাইবী নৃত্য ও বৈষ্ণব যুগীয় নৃত্যধারা রাস যার কেন্দ্রবিন্দু নট সঙ্কীর্তন ও ভঙ্গি অচৌবা।

লাই হারাওবা নৃত্যধারাকে যদিও লোকনৃত্য বলা হয়, অত্যন্ত কঠিন শৃঙ্খলাবদ্ধ নৃত্য বলে মাইবী নৃত্যকে পুরোপুরি লোকনৃত্য বলতে আমার মন সায় দেয় না। লোকনৃত্যে ব্যবহৃত হয় ঢোলক ও রাস গোষ্ঠীয় নৃত্য যাকে ধ্রুপদী মণিপুরী বলা হয় তাতে ব্যবহৃত হয় পুং অর্থাৎ মণিপুরী মৃদঙ্গ। মণিপুরের ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও কলার একটি নিজস্ব রূপ আছে।

এর এমন একটি স্বকীয়তা রয়েছে যা উপলব্ধি করতে হলে মৈতৈ মনোভাব নিয়ে তাকে দেখতে হবে। সাধারণত বাইরের থেকে যারা আসে, তারা সর্বসাধারণের মাপকাঠি দিয়ে মণিপুরীদের বিচার করতে চেষ্টা করে। এ দেশের শিল্প কৃষ্টি জানার জন্যে তারা নিজেদের ধারণার বর্ম ছাড়তে চান না। সুতরাং কিছুই জানা হয় না তাদের।

ভিন্ন জগতের রসসম্ভার আস্বাদন করতে তারা অক্ষম হয়েই থাকে। অন্যদিকে, স্বভাবত প্রগল্ভ মণিপুরীরা প্রায়শই মৈতৈ ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় নিজেদের ভালোভাবে ব্যক্ত করতে পারে না। তারা অত্যন্ত নম্র ও বিনয়ী। নিজেদের জাহির করাটা অশোভনীয় বলে মনে করে।

ফলে নিজেদের মূল কথাটা না বলাই থেকে যায়, এবং প্রবক্তারা মৌনং সম্মতি লক্ষণং মনে করে এক মাপকাঠিতে তাদের মূল্যায়ন করেন। মৈতৈরা নীতি নিয়ম মেনে চলতে ভালবাসে। ব্যক্তিগত, সামাজিক বা ধার্মিক- সব ক্ষেত্রেই তারা নিয়ম মতো চলে। দৈনন্দিন আহার বিহার থেকে আরম্ভ করে, বিয়ে পূজা, সব কিছুই এক একটা পর্ব, একটা যেন অনুষ্ঠান।

এ প্রসঙ্গে জাপানের চা-পান পর্বের কথা উল্লেখ করা যায় । পুরাকাল থেকে মণিপুরে নৃত্য-গীত শ্রুতি ও স্মৃতির মাধ্যমে গুরুর কাছ থেকে শিষ্য শিক্ষা লাভ করে আসছে। শত বাধা বিপত্তির মাঝেও সে চিন্তাসূত্র ছিঁড়ে যায়নি। লাই হারাওবার বিভিন্ন নৃত্য সম্ভার থেকে আরম্ভ করে সব কিছুই নিয়মে বাঁধা। সে রীতি অতি ভক্তিভরে তারা এখনও পালন করে।

রীতিনীতির এই কঠিন কাঠামো মণিপুরী জীবনের অঙ্গ। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাস ও সঙ্কীর্তনকে কখনই নাটকীয় উপস্থাপনা বলা যায় না। বস্তুত এ দুটি অতি উচ্চমানের ধর্মভিত্তিক নান্দনিক পরিকল্পনা। এর ক্রমবিকাশ এমন যে অতি উচ্চমানের তাল প্রবন্ধ ছন্দ বৈচিত্র্য, রাগ রাগিনী বা সংযত শরীর চালনাও প্রদর্শন বলে মনে হয় না।

মূল ভাবরসের সঙ্গে এই পরিবেশন এক হয়ে যায় এবং তা সরল থেকে যত জটিল হতে থাকে, ভক্তি-ভাব ততই বাড়তে থাকে। ধ্রুপদী মণিপুরী নৃত্যগীত সব সময়েই মন্দির বা মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কখনও তা আমাদের জন্য মনোরঞ্জনের তাগিদে হয়নি, এমনকি রাজার দরবারেও না। তাই মণিপুরে রাজার প্রশস্তিতে কোনো গান রচিত হয়নি।

রাজাই মণ্ডপে আসতেন ভক্ত হয়ে নৃত্য- গীতের রস আস্বাদন করতে। বেশির ভাগ রাজা নৃত্য-গীতে পারদর্শী ছিলেন, তাঁরা রাসে অংশগ্রহণ করতেন।পরম্পরাগতভাবে মণিপুরী নৃত্যের বিভিন্ন অঙ্গ, যেমন জাগোই-নৃত্য, চলম-পুং বা করতাল, গোষ্ঠলীলার নৃত্যসমূহ – প্রত্যেকটার প্রণালী আলাদা।

একজন শিল্পী বিশেষ একটি ধারা নিয়েই সারা জীবন চর্চা করেন। সঙ্কীর্তনে যে দোহার করতাল চলম করবেন, তিনি তা নিয়েই চর্চা করবেন, অন্য কিছু আর করবেন না। সমাজে দক্ষতার বিচার এত সূক্ষ্ম যে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বিশেষজ্ঞ হতেই হবে। বিষয়বস্তুর ধারাবাহিকতা মণিপুরী কৃষ্টির আর একটি উল্লেখযোগ্য লক্ষণ।

রাস মণ্ডপে একজন শিল্পী যখন আর একজনের পরে এসে বাজান বা গান, তখন তাঁকে আগের শিল্পী যেখানে শেষ করেছেন সেখান থেকে শুরু করতে হবে এবং সে সূত্র ধরে রাখতে হবে। এক বোল বা একই প্রবন্ধ দুবার বাজলে চলবে না। মণিপুরী কৃষ্টির ধারাবাহিকতায় কোনো ছেদ পড়েনি। নৃত্য-গীত বাদ্য চর্চা কখনও মরে যায়নি।

তাই তাকে পূর্ণজীবিত করার প্রয়োজন হয়নি। নদীর ধারা বয়ে চলেছে অবিরত। ধ্রুপদী মণিপুরী নৃত্য সংযত, ভক্তিভাব যুক্ত। চটক লাগানো, ঝলমলে নয়- নাই বা হলো। অনেক উচ্চমানের তাৎপর্যপূর্ণ শিল্পকলা আছে যা চোখ ধাঁধিয়ে দেয় না। মণিপুরী নৃত্যের সঙ্গে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার নৃত্যশৈলীর ধারার সাদৃশ্য পাওয়া যায়।

মণিপুরী নৃত্যের বিষয়ে প্রায়ই অভিযোগ শুনতে পাওয়া যায় যে এ নৃত্যে চোখ মুখের কোনো অভিব্যক্তি থাকে না, মুখাভিনয় থাকে না। এই প্রসঙ্গে শ্রী শান্তিদেব ঘোষের “শান্তিনিকেতনের নৃত্যধারা’ প্রবন্ধ থেকে একটি উদ্ধৃতির উল্লেখ করা যেতে পারে। জাভা ও বালির নৃত্য প্রসঙ্গে বলছেন।

“নানা প্রকার বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত সংগীতের ভিত্তিতেই সে দেশের নাচ রচিত। তারা গানের সঙ্গে ভারতীয় প্রথার অভিনয় পদ্ধতি গ্রহণ করেনি। অন্তত কথাকলির ন্যায় মুখাভিনয়, কথকের মতো অভিনয় তো নয়ই। তাদের অভিনয় যন্ত্রসঙ্গীতের সঙ্গে বাঁধা সমগ্র দেহভঙ্গির অভিনয়। দেহভঙ্গির অভিনয় করতে গিয়ে তারা চোখে মুখে কোনো প্রকার ভাবাভিনয় একেবারে করে না।

এক দৃষ্টি, এক মুখভাবে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তাদের অভিনয় করতে দেখেছি। এ বিষয় পুরুষ বা মেয়েতে কোনো ভেদ নেই।” মণিপুরী নৃত্যের অভিনয় জাভা, বালি বা থাইদেশের মতো। দেহাভিনয় পাই, মুখাভিনয় সেখানে নেই এবং করলে উদ্ধত বলে মনে হবে। ভক্তি রসাপ্লুত নর্তক নর্তকী অধোবদনে বিনম্র আত্মনিবেদনের নৃত্যার্ঘ অর্পণ করে।

এ নৃত্য কলাকৌশল দেখার জন্য নয়, এ নৃত্য গভীর অনুভূতি ও রসোপলব্ধির মাধ্যমস্বরূপ, ভক্তির স্থায়ী ভাবটি নৃত্যগীতের দ্বারা পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। এ নৃত্যে তাই ঘুঙুর ব্যবহার করা হয় না। ঘুঙুরের শব্দে ভক্তিভাব বিঘ্নিত হয়।

নট সঙ্কীর্তন ও রাস আজও মণিপুরে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়। লাই হারাওবা অনুষ্ঠিত হয় আগের মতোই। গোবিন্দজীর মন্দির প্রাঙ্গণে তেননিই ভক্তসমাবেশ হয়, সাষ্টাঙ্গ প্রণামের জোয়ার চলে। তবে সেখানেও আধুনিক যুগের প্রভাব পড়েছে। আগের মতো দীর্ঘদিন ধরে রাসের প্রস্তুতিপর্বে নৃত্যচর্চা করার সময় কারো হয়ে ওঠে না। তালিমের অভাবে নৃত্যের মান পড়ে গেছে।

পেশাদারী কয়েকজন রাসধারী ও সূত্রধারী রাসের মান কিছুটা বজায় রেখেছে। তাদেরও নজর অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, আরাধ্য দেবতার চেয়ে ধনী দর্শকের দিকে বেশি ঝোঁকে। দর্শককে খুশি করার জন্য তারা হয়তো চালচলনে চপলতা আনে। পুং চলমে ডিগবাজির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। গোষ্ঠলীলাতেও অনুরূপ প্রভাব দেখা যায়। তবে তারও ব্যতিক্রম আছে।

গত বছর ১৯৮৬ সনে গুরু হাওচবান অভোম্বা সিংহর জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর শিক্ষালয়ের ছাত্রীরা যে গোষ্ঠলীলা করেছিল, তাতে শিশুশিল্পীদের নৃত্যের মান যেমন উচ্চ ছিল, প্রকৃতিও সহযোগিতা করেছিল সমানভাবে। ইঞ্চলে, প্রয়াত গুরুজীর পূজা মণ্ডপে গোষ্ঠলীলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

মণ্ডপের উত্তরে মন্দির, পুবে গোহাল ও দক্ষিণে তাঁর বাসস্থান ও বিদ্যালয়। গোষ্ঠলীলা শুরু হলো। যশোদা, রোহিণী, শিশু কৃষ্ণ ও বলরাম সহ দ্বাদশ গোপবালককে মিষ্ঠান্ন বিতরণ করছেন, এমন সময় শুরু হলো প্রবল বর্ষণ। ঝম ঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। টিনের ছাদে বৃষ্টির অবিরাম শব্দ, সে শব্দ ছাপিয়ে বাজল পুং, শঙ্খ ও মন্দিরা, শোনা গেল গান। গোষ্ঠলীলা চলল তিনঘন্টা ধরে।

সে এক অপূর্ব পরিবেশ। সেই গোষ্ঠলীলাতে কৃষ্ণ সহ শিশুশিল্পীদের নৃত্য উচ্চ মানের হয়েছিল। গত একশ বছরের ইতিহাসে মণিপুরী নৃত্য জগতে এক নব জাগরণ এসেছে। শতবর্ষাধিক গুরু মৈষ্ণাম আমুবী সিংহ, গুরু হাওবাম অতোেম্বা সিংহ ও গুরু অমুদন শর্মা, মণিপুরী নৃত্য জগতের ত্রিমূর্তি— মণিপুরী নৃত্যধারার নতুন যুগের পথ প্রদর্শক।

তাঁরাই মণিপুরী নৃত্যকে মণ্ডপ থেকে মঞ্চে তুলে এনেছেন। মঞ্চ সফল নৃত্য প্রদর্শন সম্ভব হয়েছে এঁদের মতো দূরদর্শী শিক্ষক ও এখনকার ভাষায় কোরিওগ্রাফারদের জন্য। ইম্ফলে জওহুরলাল নেহেরু মণিপুরী ডান্স কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উক্ত ডান্স কলেজে আজকের যুগোপযোগী নৃত্য প্রশিক্ষণের রীতি প্রবর্তিত হয়েছে।

নতুন নতুন পরীক্ষণ চলছে। স্থাপিত হয়েছে ব্যালে ইউনিট। আজও মণিপুরে নৃত্য দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ। কোনো উৎসব, কোনো অনুষ্ঠান- এমনকি শ্রদ্ধা বাসরে শোক প্রকাশও নৃত্য ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না। নৃত্য সেখানে মণ্ডপ কিংবা মঞ্চে সীমাবদ্ধ নয়। নৃত্য সেখানে পূজা, নৃত্য শিক্ষা স্নেহের দান।

যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নৃত্য নেশা থেকে পেশায় পরিণত হয়েছে এবং নৃত্য-কল্প অর্থাৎ নৃত্য সম্পর্কে মানসিকতার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। মণিপুরী নৃত্যকে বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ। তিনি রাস নৃত্য দেখেছিলেন শ্রীহট্টে এবং মুগ্ধ হয়েছিলেন এ নৃত্যধারার কোমল আঙ্গিকে।

যে অঙ্কুর তিনি তাঁর নৃত্য নাটিকাতে বপন করেছিলেন, আজ তা বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে শান্তিদেব ঘোষ ‘শান্তিনিকেতনের নৃত্যধারা, প্রবন্ধে বলেছেন—“আধুনিক ভারতীয় নৃত্যকলার বিষয়ে কিছু বলতে গেলেই গুরুদেবের নাম সর্বাগ্রে করতে হয়।

এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে তিনি যদি শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ে নৃত্যকলাকে প্রথম উৎসাহিত না করতেন, তবে আজ আমরা আমাদের দেশে নাচের প্রচারের জন্য বহু বড় বড় প্রতিষ্ঠান ও সঙ্ঘের পরিচয় পেতাম না এবং যে সম্মান আজ নাচিয়েদের আমরা দিচ্ছি, তাও এত সহজ হতো কিনা কে জানে।”

স্বাভাবিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে, ভিন্ন ভাব প্রকাশে ব্যবহার হওয়ার দরুণ মণিপুরী নৃত্যশৈলীর একটি প্রবাসী চরিত্র গঠিত হয়েছে; তার পুষ্পের রং ও সুবাস কিছু আলাদা হয়ে গেছে। সমসাময়িক কালে মণিপুরের বাইরে মণিপুরী নৃত্যের দুটি ধারা লক্ষ্য করা যায় । প্রথমটি রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যে। এখানে নৃত্যের ব্যবহার শুধু মূল ভাব প্রকাশ করার জন্য।

নৃত্য যদি বেশি প্রধান্য পায় তবে ভাব প্রকাশ বিঘ্নিত হবে। তাই নৃত্যনাট্যে ব্যক্তি বিশেষের নৃত্য পারদর্শিতা প্রদর্শনের স্থল খুবই সীমিত। আবার শান্তিদেব ঘোষের সাহায্য নিয়ে বলি : “গুরুদেব নিজে কখনও নাচকে খুব সঙ্কীর্ণ অর্থে গ্রহণ করেননি। তাঁর কাছে নাচ হলো সাধারণ অভিনয়েরই একটি উৎকৃষ্ট মধুর সংস্করণ, সাধারণ অভিনয়কে আরও চিত্তাকর্ষক করে তুলতে পারে নাচ।

যেমন সাধারণ ভাষায় প্রকাশিত মনের আবেগকে আরও চিত্তাকর্ষক করে তোলে কবিতার ভাষা ও অধিকতর মধুর করে তোলে গানের সুর” মণিপুরী, কথাকলি, জাপান, জাভা ও বালিদেশের নাচ তাঁর নৃত্যনাটকে ব্যবহার করেছেন স্থল বিশেষে। কোমল ভাব প্রকাশে লাস্য নৃত্য ও কঠোর ভাব প্রকাশে, যেমন কোটালের নৃত্যে ব্যবহার করেছেন কথাকলি ।

মণিপুরী নৃত্য কোমল কিন্তু সরল নয়। যে নিয়মানুবর্তিতা ও অনুশীলনের ফলে মণিপুরী নৃত্যের স্বাভাবিক নমনীয়তা আসে, তার জন্য প্রয়োজন বহু বছরের সাধনা। এখন সচরাচর যে সকল নৃত্যভঙ্গিমা নৃত্যনাট্যতে দেখা যায় তা সরলীকৃত হতে হতে একেবারে জলো হয়ে গেছে।

এমনও হতে পারে যে কয়েকটি মাত্র ভঙ্গিমা অতি ব্যবহারের ফলে অভিনবত্ব হারিয়ে অতি পরিচিত হয়ে পড়েছে। ফলে তাদের আকর্ষণ কমে গেছে। কোথাও দেখা যায় ভঙ্গিমাগুলোর বিকৃতি এসে গেছে। আমার ধারণা রবীন্দ্রনাথ কখনোই চাননি যে একই শিল্পী মণিপুরী ও কথাকলি, দুটো পরস্পরবিরোধী নৃত্যপদ্ধতি আয়ত্ত করবে।

যে লাস্য ভাবধারার ভূমিকা নেবে সে মণিপুরী করুক এবং কঠোর ভাব প্রকাশের জন্য অন্যরা, কথাকলি করুক একই অঙ্গে মণিপুরী ও কথাকলি আয়ত্তের চেষ্টা দুই—একটি নৃত্যপদ্ধতি আয়ত্ব করাই যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ দ্বিতীয় ধারা হলো মণ্ডপ থেকে মঞ্চে নিয়ে আসা মণিপুরী নৃত্য যার চরিত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে।

লাই হারাওবা বা রাস যখন মন্দির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় তখন শিল্পী ও দর্শকের মধ্যে একটা ভাব-রসের যোগসূত্র থাকে। দুপক্ষই ভক্তি রসাপুত- তাদের ভাবের আদান প্রদানে কোনো সমস্যা নেই। একজন নৃত্যপূজা করছে, অন্যজন তা দেখে নয়ন সার্থক করছে— দুজনেরই উদ্দেশ্য উপাসনা।

চিত্তের এই উচ্চস্তরে তারা কামনা বাসনা পেরিয়ে আরাধ্য দেবতার মাঝে নিজের নৈর্ব্যক্তিক চৈতন্যকে উপলব্ধি করে। মন্দিরে রাস অথবা লাই হারাওবার কোনো সময়সীমা নেই। সারা রাত ধরে চলে। শিল্পীর সংখ্যাও নির্দিষ্ট নয়। লাই হারাওবাতে শতাধিক শিল্পী অংশগ্রহণ করে। রাসে শিল্পীর সংখ্যা অপরিমিত।

যখন মণ্ডপ থেকে মঞ্চে এই নৃত্যকলাকে নিয়ে আসা হলো, তখন কয়েকটি সমস্যা দেখা দিল। প্রথমত, শিল্পী ও দর্শকের ভাব রসের ঐক্য হয়তো যারা নাচ দেখতে এসেছেন, এ নৃত্যধারা সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই নেই। তাই পরিবেশন রীতি বদলাতে হলো।

দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে, তাই যে রাস সারা রাত ধরে চলত, তা সংক্ষিপ্ত করে আধঘন্টার মধ্যে পরিবেশন করতে হলো। শিল্পীর সংখ্যা আট থেকে দশজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হলো। এসব পরিবর্তন সত্ত্বেও কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে যাতে মূল ভাব- রস যেন কোনো অংশে বিঘ্নিত না হয়। এ কাজ খুবই কঠিন।

এ অসাধ্য সাধন সম্ভব হয়েছে গুরুআমুবী প্রমুখ সৃজনশীল শিল্পীদের জন্য। তা যদি না হতো তবে মণিপুরী নৃত্য মণিপুরের বাইরে আসতে পারতো না। বাইরের জগত এ নৃত্যের রস আস্বাদন থেকে বঞ্চিত রয়ে যেত। মঞ্চে আসার সঙ্গে সঙ্গে মণিপুরী নৃত্যকে আরও একটি চারিত্রিক পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

মণ্ডপে নৃত্যপূজা ছিল উপাসনা, মঞ্চে নৃত্য প্রদর্শন করা হয় মনোরঞ্জনের জন্য। সুতরাং প্রয়োজন হলো বৈচিত্র্যের। বৈচিত্র্য থাকবে, কিন্তু ধারা অব্যাহত থাকবে- তার পরিকল্পনাও নৃত্যরচনা- সেও কঠিন কাজ। মণিপুরী নৃত্যের ত্রিমূর্তি— গুরু মৈষ্ণাম অমুবী, গুরু হাওৰাম অতোম্বা ও গুরু অমুদন সনাতনপন্থী মনোভাব নিয়েও এ পরিবর্তনের মোকাবিলা করেছিলেন।

বৈচিত্র্য আনতে গিয়ে আমরা যেন মূল ভাব থেকে সরে না যাই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়। কেউ কেউ মণিপুরী নৃত্য পরিবেশন করতে গিয়ে বেশি অভিনয় করে ফেলেছেন- এতে নৃত্যধারার চরিত্র ব্যাহত হয়। মণিপুরী নৃত্যের বৈশিষ্ট্য তার শান্তশ্রী, তার ভক্তিময়তা, তার নম্র মুখরতা। সে উদ্দাম আত্মপ্রকাশে কুণ্ঠিত।

মণিপুরী নাচে আলাদা ভাবে কোনো হস্তের, কোনো দ্রুভঙ্গীর কিংবা মুখমণ্ডলে কোনো অভিব্যক্তির গুরুত্ব দেওয়া হয় না। জাহির করা হয় না তাল লয়ের কালোয়াতি। সব কিছু মিলিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় একটি সামগ্রিক রূপকল্প। এ কাজে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-পা থেকে মাথা পর্যন্ত, একই সঙ্গে অংশ নেয় । আজকের যুগে সবাই ছুটে চলেছে। গতি দ্রুত না হলে পিছিয়ে পড়তে হবে।

আকর্ষণীয় করার জন্য কেউ কেউ হয়তো সাবলীল লাস্য নৃত্যকে করে ফেলছেন অত্যাধিক দ্রুত। ভ্রমরী গতিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, লাস্যের চেয়ে তাণ্ডবের পদচালনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। ব্যবহার করছেন ঘুঙুর। এতে মণিপুরী নৃত্যের স্বভাব বদলে যাচ্ছে। আজকের দিনে ঐতিহ্যের স্বকীয়তা সম্পর্কে প্রত্যেক গোষ্ঠী অত্যন্ত সচেতন, স্পর্শকাতর ।

 

মণিপুরী নৃত্যে দুটি ধারা দেবযানী চলিহা

 

তাই কৃষ্টির যথাযথ প্রতিফলন যাতে হয় তার দিকে নজর রাখা প্রয়োজন। একধারে লাই হাবাওরা ও অন্য দিকে বৈষ্ণব ভক্তিতত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত মণিপুরী সঙ্কীর্তন ও রাসলীলা সফল হবে, সে মণ্ডপেই হোক আর মঞ্চেই হোক, যদি ভাব-রসের মাপকাঠি সে বজায় রাখতে পারে।

দর্শকের হৃদয়গত ভাবকে শিল্পী যদি আপন ভাবময় সম্বিতের সঙ্গে এক করে দিতে পারে তবেই সে নৃত্য রসোত্তীর্ণ হবে। রসোত্তীর্ণ নৃত্যকলা ব্যবহারিক প্রয়োজন ছাপিয়ে স্বার্থের উর্ধ্বে নিরাসক্ত পরম পরিতৃপ্তি এনে দেবে। কৃতজ্ঞতা জানাই গুরু টি নদীয়া সিংহ ও মাস্টারমশাই শ্রী প্রহ্লাদ দাসকে।

এ প্রবন্ধ লিখতে নিম্নলিখিত লেখক ও তাঁদের লেখার সাহায্য নিয়েছি তাঁদের কৃতজ্ঞতা জানাই । শান্তিদেব ঘোষ লিখিত ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত’ বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ শ্রী সুরচান্দ শর্মার রস হুমফুমরি’- মণিপুর স্টেট কলা একাডেমীর কলকাতা প্রকাশন প্রবাস জীবন চৌধুরী লিখিত ‘কাব্য মীমাংসা’- পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পযদের প্রকাশন ৷

M. Hiriyanna লিখিত Art Experience’ karyalay publishers, Madras Y. Ranjana Devi লিখিত Origin and Development of Manipuri Nant Sankritans GAIDM jounal 1982 G. Surchand Sarma Bhangi GAIDM journal 1982 E.

Nilkanta Singh লিখিত Seminar paper 1986 Classical Manipuri Dance and Guru Atomba R. K. Suighajit Singh_ Manipuri Dance and its propagation Seminar paper 1986.

R. K. Priyogopal Singh – Manopuri Dance Contemporary trends in Manipuri Dance Siminar paper 1985 হাওবাম তোম্বা লিখিত- মণিপুরী রাস- Souvenior Guru Atomba Birth Centenary 1986.

 

আরও দেখুনঃ

Leave a Comment