প্রদর্শনী নাচের ক্রমবিবর্তন এবং প্রাচ্য সভ্যতার ভূমিকা

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় – প্রদর্শনী নাচের ক্রমবিবর্তন এবং প্রাচ্য সভ্যতার ভূমিকা।যা “যুগ যুগব্যাপী নাচ” খন্ডের অন্তর্ভুক্ত।

প্রদর্শনী নাচের ক্রমবিবর্তন এবং প্রাচ্য সভ্যতার ভূমিকা

প্রদর্শনী নাচের ক্রমবিবর্তন এবং প্রাচ্য সভ্যতার ভূমিকা

নাচের প্রকৃত যাইহোক না কেন, এটা কি ছন্দবদ্ধভাবে বাড়তি প্রাণ প্রাচুর্যের উৎগীরণ অথবা অভিপ্রায়মূলক ধর্মীয় ক্রিয়া, এটার কোন দর্শকের প্রয়োজন নাই এমনকি একজন স্বাক্ষীরও । তবুও এত কিছুর পরেও এটার হর্ষোল্লাস এবং সর্বজনীন পূজার জন্য নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানাদির বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে সেখানে আগে ভাগে পরিবর্তনের বিরাট কর্মপদ্ধতি বীজ অঙ্কুরিত হয় যা ক্রমশঃ নাচের গঠনশৈলীকে রূপান্তরিত করে এক অনৈচ্ছিক স্বয়ংক্রিয় কর্মচাঞ্চল্যে, ক্ষীপ্ত দেহভঙ্গির জগত এবং একটা ধর্মীয় পদ্ধতির উৎসব অনুষ্ঠান থেকে শিল্প সচেতন কাজের মধ্যে পর্যবেক্ষণের অভিপ্রায়।

পরিবর্তন অনিবার্য ছিল। যেমন প্রকৃত আবেগময় দৃশ্যের বিষয় মানুষের নাচে যেরূপ উন্মুক্ত অবস্থায় ছিল তদরূপ শিম্পাঞ্জীর নাচেও থাকে কিন্তু ধর্মীয় প্রথাসিদ্ধভাবে সেটা হয় না। সৃজনশীল আবেগ সংযোগের পরে আর্টের কাজের প্রয়োজনীয় গুণাবলী আরোপণ হচ্ছে ফরমের অবয় গঠন, সচেতনতায় সুষম সমন্বয় এবং বুদ্ধিদীপ্ত নির্মাণশৈলী, এরই মধ্যে অতীব প্রয়োজনীয় নাচের মধ্য থেকে শিল্পকর্ম অনুরক্ত ভূমিকা তৈরী করে।

জনগোষ্ঠীর জীবন ও কল্যাণের জন্য লাগামহীন উন্নতকরণ নিবারণ করা একান্তভাবেই এটার প্রয়োজন, এটা পরিকল্পনার ডাক দেয় এবং মহামূল্যবান ধারায় ব্যক্ত করে ও পরবর্তী বংশধরদের কাছে ঐতিহ্যের প্রতি একান্ত বিশ্বস্ত দৃঢ় অনুরাগ দাবী করে।

প্রত্যেক ভুল ক্ষমতা ক্ষয় করে এবং ঈস্পিত ফল দানের আকর্ষণ অনিশ্চিত করে তোলে । প্রত্যেক নাচুয়ে ও দর্শক উভয়েই সঠিকতার উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখে। এটা শুনা যায় যে, নিউ হ্যাব্রীজের গুয়া দ্বীপে বৃদ্ধ লোকদের অনুষ্ঠানিকভাবে তীর ধনুক দিয়ে দাঁড় করান হয় কোন নাচুয়ে ভুল করলে তাকে তীরাঘাত করার জন্য। অতএব এটা জরুরী যে, জনগোষ্ঠীর যত লোকজন সম্ভব তাদের নির্দেশ করা, যেন নাচ গঠনে যথাযথ নৈপূণ্য বজায় থাকে ।

আদিম মানুষের মধ্যে এই রকম নির্দেশ সাধারণতঃ পরিবারের কেন্দ্র থেকে অথবা জনগোষ্ঠীর কোন ছোট বিভাগের মধ্যে থেকে আসে। মূলকৃষ্টিতে অস্ট্রেলিয়ান ও মধ্য আফ্রিকার পিগমিদের মধ্যে মায়েরা শিশুদের নাচ শিখায়, উপজাতীয় কৃষ্টিতে বয়ঃপ্রাপ্ত যুবক যুবতীদের সূচনার ধর্মীয় প্রথায় জনগোষ্ঠীর নাচ শিখা একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কিন্তু এটা সর্বদা পর্যাপ্ত না : নিউগিনির কতক জনগোষ্ঠী তাদের পুত্রদের নাচ শিখার জন্য বিখ্যাত স্থানে পাঠায় যাতে তারা নিজেদের যোগ্য (নাচে) করে তুলতে পারে এবং নাচের নেতা বনতে পারে এবং তাদের গ্রামে নাচের ওস্তাদ হতে পারে। তারা নাচের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির জন্য সপ্তাহ, মাস এমনকি বৎসর পূর্বে থেকে আরম্ভ করে যতদিন না প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি ও অবস্থান উৎকর্ষতা লাভ করে।

এই রকমের নাচ অপরিহার্যভাবে হয়ে উঠে তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অক্ষতিকারক, সচেতন ও ব্যক্তিগত প্রাপ্তির স্বীকৃতি। এমনকি নিম্ন স্তরের কৃষ্টির এখানে সেখানে আমরা নাচের মধ্যে আধ্যাত্মিক স্বত্বাধিকারীর প্রমাণ পাই। নিউ বৃটেনের গাজেলী উপদ্বীপে প্রতিটি নতুন নাচের উদ্ভাবকের অধিকার শুধুমাত্র উদ্ভাবকের দ্বারা সংরক্ষিত হয় না বরং তার উত্তরাধিকারীরও থাকে এবং নিজের নাচ ও অন্যের নাচের অনুমতি ছাড়া কেউই নাচ করতে সাহস দেখায় না ।

যখন আমরা শুনি, তারচেয়ে যেটা হল উত্তর-পশ্চিম মেলেনেশিয়ার নিউ বৃটেনে, ক্যারোলাইনের ইয়াপ দ্বীপে এবং ফিজি দ্বীপপুঞ্জের নাচ হস্তান্তর করতে ও নতুন নাচ মহড়া করতে বিনিময় দেয়া হত ও হয়, এইভাবে তার ধর্মীয় মূল্য বর্জিত হয়। এটা কেন হয় কারণ ক্রেতা আশা করে তার কেনার মধ্য দিয়ে শক্তিশালী যাদুর কার্যকর নিরাপত্তা কিন্তু এই যাদু অবশ্য তাদের নিজেদের প্রদর্শনী শক্তির উপর নির্ভরশীল এবং কি একটা হতে পারে তা কি আর্ট ?

যেটা একটা শিল্পকর্ম হয়ে উঠে এই ধরনের অনুষ্ঠানে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী অনুরূপ বিবর্তনের মধ্যে নিজেকে শিল্পী হিসাবে প্রত্যাখান করতে পারে না। মুখোশ-নাচ কতক দিক্ থেকে এই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করেছে। সমগ্র উপজাতি এক সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে পারে না।

পুরুষের জন্য সম্পূর্ণ সংরক্ষিত নাচ সীমিত কিন্তু এমনকি পুরুষের মধ্যে প্রত্যেকেই সমস্ত নাচের জন্য মানানসই ও উপযুক্ত না। যতক্ষণ পর্যন্ত অপশক্তি বিদ্যা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয়, অন্যের চেয়ে কোন একজন নির্দিষ্ট দৈব-শক্তির প্রতি ঘনিষ্ঠ হয়ে পরে এবং বিশেষভাবে তাকে তার প্রতিনিধিত্ব করতে হয় এবং তারসঙ্গে তাকে একাত্ম হতে হয়।

এই পৃথকীকরণের মধ্যে প্রদর্শনী নাচের জীবাণু লুকায়ে থাকে : প্রত্যেক নাচে জনগোষ্ঠীকে সক্রিয় সদস্য ও নীরব সদস্যে বিভক্ত করে, অংশগ্রহণকারী ও দর্শক দুইভাগে। এটা একটা যুক্তিসঙ্গত অগ্রধাপ মাত্র, তারচেয়ে ও বেশী নিউগিনির মত প্রাচীন কৃষ্টিতে বড় ধরনের নাচের অনুষ্ঠানে দর্শকদের জন্য বিশেষ রকমের বেঞ্চ তৈরী করা হত এবং মাইক্রোনেশিয়ার নাচ হত মঞ্চে এবং গ্যালারীর উচ্চ মঞ্চে।

এটা শুধুমাত্র একটা দৃশ্যমান বৈপরীত্য যে, মুখোশ নাচে অংশগ্রহণকারী তার নিজের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র দৃশ্যমান করতে চায় যেমন তারা “আমিত্ব’ কে অস্বীকার করার প্রতিযোগীতা চলায় এবং ব্যক্তিত্বকে আত্মসমর্পণ করে থাকে। পক্ষান্তরে যে, সমস্ত জাতির মধ্যে মুখোশহীন নাচের উন্মেষ হয়েছে তারা প্রায় আত্ম-সচেতন এবং দর্শক-সচেতন, আত্মকেন্দ্রীকতা, শিল্পকলা নৈপূণ্যের দিকের পথ পরিভ্রমণ করে ।

সারিবদ্ধ নাচে বিশেষ করে যে সমস্ত দর্শক সামনে বসে থাকে এবং যাদের দিকে নাচুয়ে তাকায়ে থাকে অবশ্যম্ভাবীরূপে তারা ক্রমে নাচের লক্ষ্য ও বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। ইয়াপদ্বীপে নাচের নেতা দর্শকদের বিপরীতে সর্বোচ্চ সারিতে দাঁড়ায়।

এটা সাধারণতঃ নাচুয়েকে দ্রুত গমনে উদ্বুদ্ধ করে, যে নিজেকে প্রণয়াকাঙ্খীর দৃষ্টির কেন্দ্র বলে অনুভব করে বিশেষ করে বিপরীত লিঙ্গ থেকে যেটার যাদুময় তাৎপর্য স্বাধীনভাবে পারফরমেন্সকে উত্তেজিত করে। উত্তেজক প্রধাননতঃ খাঁটি শারীরিক।

দেহকেন্দ্রীক প্রাপ্ত শক্তি, সহিষ্ণুতা ও দক্ষতা চিহ্নিত করে। শক্তি এবং সহিষ্ণুতা এই আলোচনার অনেক স্থানে উল্লেখ হয়েছে-তারা এখনও নাচের অংশ, ইউরোপের চাষী বালকদের আজও আদর্শ, ভলটা এবং নিজারডার গঠনশৈলীতে এমনকি সেটা বলরুমে দৃশ্যমান হতে পারে। যদিও পেশী শক্তির নাচ অনেকাংশে ধর্মীয় পদ্ধতির লক্ষ্যের বশবর্তী হয়ে পারে, তারা অবশ্য তা সত্ত্বেও হয়ে উঠে আমোদ-প্রমোদের মধ্যে প্রাণবন্ত, বলিষ্ঠ শক্তিপরাক্রম শীরীরিক কসরৎ প্রদর্শনের সুযোগ।

ঘনিষ্ঠভাবে এক বংশজাত পৌরুষ নাচ হল নাচের দক্ষতা। এখানেও ধর্মীয় হর্ষোল্লাস উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে আছে। ক্যালিফোর্ণিয়া ও সিয়েরালিওনে নাচ কখন এ্যাক্রোব্যাটিক আরোহণক্ষম ভোজ উৎসবে অধঃপতিত হয়েছে এবং সিয়েরালিওনে খাঁটি প্রাচীন রোপণকারী কৃষ্টি মুন্ডুশিকারী কৃষ্টিতে-এই সকল এ্যাক্রোব্যাটিক হর্ষোল্লাসজনক বৈশিষ্ট্য স্পষ্টরূপে সংযোজিত হয়েছে।

যাইহোক, এই সম্মিলন দূর্লভ যখন হাতের কৌশলের সহযোগ, ব্যালেন্সের চাতুর্য এবং লক্ষ্যভেদ নাচে থাকা খুব স্বাভাবিক। এটা তাৎপর্যময় যে, পুরাতন মিসরে এই একই শব্দ হবজ (hbj) ব্যবহৃত হয় সাধারণ নাচে এবং জিমন্যাসটিক ব্যায়ামে যা “দি ব্রিজ” নামে পরিচিত, যেটা মধ্য ও নতুন রাজবংশের স্মৃতি-স্তম্ভে উৎকীর্ণ দেখা যায় (প্লেট-৮)।

হয়ত আরো অনেক উদাহরণ দৃষ্টান্ত স্বরূপ উল্লেখ করা যায় : ম্যাক্সিকান মেয়ে রিবোজো যখন নাচে পা দিয়ে মাটিতে সার্শির মধ্যে গিরা বাঁধে, সুমাত্রার কুামারী মাথা ও হাতে জ্বলন্ত তিনটি মোমবাতির ট্রে (থালা) নিয়ে ব্যালেন্স রেখে নাচে, তিব্বতের অতিভৌতিক নাচুয়ের দড়ি নাচ, প্রাচীন গ্রীসের ব্যালেন্স এর চাতুর্য, সাইপ্রাসের ভেলকিবাজির মেলা, গ্রাসলট্যাঞ্জ এর নাচের নেতার মাথার উপর পূর্ণ বিকার থাকে (বৈজ্ঞানিক গ্লাস) মধ্য যুগে এবং সমসাময়িক ল্যান্ডলার।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

তার আফ্রিকান অংশে লোয়ানগোর কুমারী তার মাথায় বোতল রেখে নাচে, নাচের মধ্যে সবিয়ান চাষী দন্ডের দূরে রাখা পানির গ্লাস আঘাত করতে পারলে মোরগ জিতে নিতে পারে, পৃথিবীর সমস্ত অংশে তলোয়ার নাচের মধ্যে বিদ্যুৎ গতি থাকে তথাপি সম্পূর্ণ যুদ্ধে বিপক্ষকে আহত না করে সংঘটিত হয়, নমনীয় ধীরে ধীরে লোপ পায় এবং সরুস্থানে ক্রীড়ার ছলে বিপজ্জনক অস্ত্র নিয়ে লাফালাফি করে কোনরকম সংঘাত অথবা দ্বন্দ্ব ছাড়া এবং জ্বলজ্বলে ব্লেডের বৈচিত্রময় খেলায় জাঁকালো পৌরুষদৃপ্ত আর্টে একত্রিত হয়, নিষ্ঠুর যুদ্ধ বিষয় প্রায় সম্পূর্ণভাবে আর্টের (স্থান বিনিময়) রূপান্তর ও খাঁটিত্বলাভ করে।

দক্ষতা, , দৈহিক গঠন, নমনীয়তা, শক্তি এবং সহিষ্ণুতা প্রদর্শিত হয়-ভাল নাচুয়ে লোলুপ প্রেমপাত্র অথবা স্বামী বা স্ত্রী কিন্তু খারাপ নাচ বিবাহের জন্য বাধা স্বরূপ। কিন্তু যৌন উত্তেজক এবং একেশ্বরবাদ একই ভূমিতে বিস্তার লাভ করেছে। যে নাচুয়ে যাদুমন্ত্র প্রদর্শন করায়াত্ব করে তার ফলশ্রুতিতে ব্যক্তিগত মোহনীশক্তি আরম্ভ করেতে উদ্যোগী হয় সেটা হল একজন নাচের শিল্পী হবার পথ।

এমনকি অস্ট্রেলিয়াতে ভাল নাচুয়ে তার বন্ধুবান্ধব থেকে অভিনন্দিত হয়, মহিলাদের থেকে অনুরাগ এবং আগন্তুক থেকে পান পারিশ্রমিক। মেলেনেশিয়াতে সে ভাল গায়ক (গায়েন) থেকে উপরের স্থানে আরোপিত হয় এবং নতুন আয়ারল্যান্ডে শিল্পকলায় দক্ষ গুণবান নাচুয়ে “পৃথিবীর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জিনিস” বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু এই শিল্পকলায় দক্ষ ব্যক্তি পেশাগত শিল্পী না- আমাদের সঙ্গে উৎসবমুখী সৌখিন খেলোয়াড় যেমন করে সেও প্রায়একই রকম অবস্থান ধরে রাখতে পারে। মধ্য কৃষ্টির যুগে পেশাদার প্রদর্শনীর নাচের উন্নয়ন খুব সংকীর্ণ ভাবেও অসম্ভব।

প্রভুত্বকারী কৃষ্টির যুগ তথা পরবর্তী উপজাতীয় কৃষ্টি মানব জাতির কাছে প্রভু ও ভৃত্য এই সামাজিক বিভক্তি এনে দিয়েছেযা ছাড়া এটার আস্তিত্ব সম্ভব না। এরাই প্রথম যারা দুই উপাদানে শিল্পসম্মত গঠনশৈলীর গুরুত্বপূর্ণ বিভক্তির কারণ, শিল্পীরকাজের দস্তুরি ও দাম দেবার আত্মতৃপ্তিবোধকারী অথবা প্রভুত্বকারী দর্শক। এইভাবে আর্ট মৌলিকভাবে পারফমেন্সের ভিত্তিতে পুরস্কার পাবার স্থান করে নিল। নাচের জন্য পরবর্তী ধাপ হল পেশাদার নাচ গঠন।

যদিও পেশাদার প্রদর্শনী নাচে রূপান্তর সঠিকভাবে সংঙ্গায়িত হয় না ও করা যায় না। উভয় ইন্ডিয়ান মহিলা নাচুয়ে যাদেরকে আমরা অভ্যাসবশতঃ পর্তুগীজ নাম বেলাডারিয়াস অথবা বায়েডেরাস বলে ডাকি এবং তাদের অন্য অংশ হাউসা উপজাতির মধ্যে কোকা যুবতী, যারা অন্ধভক্ত এবং এটার ধর্মযাজকের প্রতি গভীর অনুরক্ত, তথাপি “উৎসব অনুষ্ঠানে ঢোলের বাজনা ও গানের সঙ্গতে অশালীন নাচের উন্মত্ত জনতার মনোরঞ্জন করে”, এখনও কমবেশী তা ধর্মীয় পদ্ধতির সঙ্গে বন্ধন যুক্ত এবং আদিম মানুষের যুবতীদের নাচের দিকে ফিরে যায় ।

এই সুস্পষ্ট বৈপরীত্যের মূল হল এই ধারণা যে, পবিত্র যুবব্যক্তি বিশেষ ধরনের যাদুশক্তি ধারণ করতে পারে যতবেশীকুমারী দলে বাড়বে কার্যকারিতা (যাদুর) বেশী হবে। সুতরাং আমরা বুঝতে পারি কেন ইয়াপ-দ্বীপে মৃতের পুনর্জাগরণের জন্য মৃত্যুর ঘটনায় উচ্চমূল্যে কুমারীদের নাচের অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট করান হত। উচ্চকৃষ্টির প্রান্ত অঞ্চলে কুমারী নাচুয়ের বিচ্ছিন্নতা অপরিহার্য।

জনগণের সামাজিক ঐক্য ধ্বংসের জন্য এবং মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপ পৃথক করণের মধ্যে দিয়ে পেশাভিত্তিক শ্রেণীবিণ্যাস, পদমর্যাদা ও বর্ণপ্রথা খুব প্রয়োজনীয় উচ্চকৃষ্টির বৈশিষ্ট্য। ধর্মীয় পদ্ধতির মহিলা নাচুয়েদের পরিবার, গৃহস্থালীর ও মাঠের কাজ থেকে ছাড়ায়ে আনা হয়, কম বয়স থেকে ধর্মস্থনে, পদমর্যাদা অনুসারে তাদের আর্টে শিক্ষাঅভ্যাস দেয়া হয় এবং ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী নাচার রীতিনীতি পালন করান হয় ।

এখানে একটা কৌতূহলোদ্দীপক পরিবর্তন ঘটে গেছে যার তথ্যসমূহ আমাদের প্রয়োজনের প্রচ্ছন্ন ধারার বাইরে পরে। মন্দিরের মধ্যে নাচুয়ে দেবদাসী হয় (গড়ের) দেবতার দাস, গড়ের সেবায় উৎসর্গীকৃত যেমন মঠে আবদ্ধ খৃষ্টিয়ান নান।

কিন্তু এই আত্মসমর্পণ কোনভাবেই আধ্যাত্মিকভাবে প্রাপ্ত বিবাহের অঙ্গুরী যৌন মিলন কে আইনতঃ সিদ্ধ করতে পারে না; যখন কুমারী পর্যাপ্ত বয়ঃপ্রাপ্ত হয় তখন পাথরের শিব-দেবতার লিঙ্গ তার সতীত্ব নিয়ে নেয় এবং এই কাজের মধ্য দিয়ে সে (কুমারী মেয়ে) দেবতার প্রতিনিধি পুরোহিতের অধিকারভুক্ত হয়ে পরে।

প্রতীকের বিটে লেনদেনের মধ্য দিয়ে পবিত্র কুমারী বিভিন্ন ধর্মের মন্দিরে হয়ে উঠে পূত-লম্পট- সেই সমস্ত স্থানে বেশী স্পষ্ট যেখানে দুই চিন্তাধারার জগতের বৈপরীত্য সংঘাতময় : অস্পর্শ কুমারীর দ্বারা উর্বরা শক্তি বৃদ্ধির যাদু-টোনা করা এবং যৌনমিলনের উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে উর্বরা শক্তি বৃদ্ধির যাদুমন্ত্র ।

প্রাচীনকালে নিকট প্রাচ্যে উৎসর্গীকৃত মন্দির নর্তকী ও বিনিময়গ্রাহী বারবনিতার সম্মিলনের উদাহরণ আমাদের আছে এবং আরো এটার মত সম্পর্কযুক্ত ধর্মীয় প্রথা প্রাচীন ম্যাক্সিকোতে দেখা যায়। হিন্দু কৃষ্টির সংকীর্ণ স্তরে দলবদ্ধ মন্দির নর্তকীর মধ্যে দিয়ে রাজকীয় দরবারী ব্যালের উন্নয়ন ঘটে।

একদা দেবতার প্রিয়জন, নর্তকী, এখন যুবরাজের উপ-পত্নী হয়ে উঠে। কিন্তু ধর্মীয় প্রথার এমন অবক্ষয়ের মধ্যেও যাদু এবং ধর্মীয় ধারণা এখনও অগ্রে বাজে ঃ যদি কুমারীত্বের আর কোন দাবী না থাকে তথাপি গর্ভধারণ নাচুয়েদের নাচের বাইরে রাখতে পারে।

ঈশ্বরের প্রতি প্রার্থনাকালের আহ্বান অপরিহার্য সত্বেও তা মৌলিক ভক্তির তাৎপর্যের সাক্ষ্য বহন করে ঃ যেমন আমেরিকান ইন্ডিয়ানগণ নাচের পূর্বে চারবার প্রার্থনা করে সেইরূপ ইন্ডিয়াতে নাচ চলতে থাকে ভক্তি আপ্লুত প্রার্থনার সঙ্গে চারবার তা পুনরাবৃত্তি হয় এমনকি সেটা স্বতন্ত্র দলের জনগণের অনুষ্ঠান হলেও। হিন্দুদের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে নাচহীন প্রার্থনা অশালীন বলে বিবেচিত হয় এবং যে সেটা প্রত্যক্ষ করবে সে সন্তানহীন হবে এবং পুনর্জন্মে পশু হয়ে জন্মাবে।

 

প্রদর্শনী নাচের ক্রমবিবর্তন এবং প্রাচ্য সভ্যতার ভূমিকা

 

এইরূপে এটা প্রধান প্রাচীন ধর্মীয় কারণ যেটার সবচেয়ে বড় স্বাক্ষর হল সত্যিকার ভাবে একটা প্রদর্শনী নাচে মেয়েরাই অংশ নেয়, পুরুষদের জন্য তা হয় না। সমস্ত কিছু মৌলিক ধর্মীয় তাৎপর্য অপসৃত হয়ে আসলেও এটা নারীগণ মেনে আসছে যে, প্রভুত্বকারী কৃষ্টিতে মেয়েদের যে মর্যদা স্বীকার করা হয়েছে তা আশ্চর্যজনক না, যেখানে উল্লাস ও আনন্দ পুরুষদের দ্বারা নির্ধারিত হয়।

আরও দেখুনঃ

Leave a Comment