নৃত্যভাষা

নৃত্যভাষা : হোমার-এর কাব্য আস্বাদন করতে হলে গ্রীক জানা দরকার, কালিদাসের রসাস্বাদনে সংস্কৃত জানা দরকার, সেক্সপীয়রের মূল্যায়নে ইংরাজীর প্রয়োজন। কিন্তু রাশিয়ার Swan Dance বা আমাদের কথাকলি ভরতনাট্যম্—ভাষা না জানলেও উপভোগ ও অর্থবোধ করা যায়। সংস্কৃতিগত বৈষম্য এখানে গৌণ বিষয়।

ভরতনাট্যম নৃত্যরত শিল্পী [ Bharatnatym Mudra ]
ভরতনাট্যম নৃত্যরত শিল্পী [ Bharatnatym Mudra ]

 

Table of Contents

নৃত্যভাষা

তামিল, তেলেগু বা মালয়ালম না জেনেও কথাকলি, কুচিপুড়ি বা ভরতনাট্যম থেকে আনন্দলাভ করা যে কোনো ভাষাভাষী লোকের পক্ষে অনেক সহজ। ভাষার বেড়া ভেদ করে এইসব শিল্পমাধ্যমে এমন এক সার্বিক রূপ প্রকাশ পায় যা সৌন্দর্যতত্ত্বের দিক থেকে উপভোগ্য। এখানে এম্প্যাথির সৃষ্টি সহজ, ভাষার ক্ষেত্রে বিশেষ করে অনুবাদের মাধ্যমে এই এপ্যাথি সৃষ্টি করা খুব কঠিন।

ভাষা, সাহিত্য বা অন্যান্য শিল্পমাধ্যম গড়ে ওঠার আগেই নৃত্য হল মানুষের আবেগ প্রকাশের প্রাচীনতম বাহন। শিল্প যেহেতু মানুষের সজ্ঞান মনের সৃষ্টি, সেহেতু মানুষের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে শিল্পের উৎপত্তির ইতিহাস যুক্ত।

“Dance is the mother of all arts. Music and poetry exist in time; painting and architecture in space. But the dance lives at once in time and space. The creator and the thing created, the artiste and the work are still one and the same things.

Rhythmical patterns of movement, the plastic sense of space, the vivid representation of a world seen and imagined-these things man creates in his own body in the dance before he uses substances and stone and word to give expression to his inner experience.”

(Curt Sachs: World History of Dance)

এই হচ্ছে প্রাচীনতম ভাষা। হস্তমুদ্রায় ভাব প্রকাশক অর্থ, দেহভঙ্গির বিচিত্র সঙ্গীতে সিন্ধু তরঙ্গের হিল্লোল, গ্রীবাবিভঙ্গে লীলাবিলাস, গর্ব বা আত্মনিবেদন, আঁখিপল্লবের উম্মোচন ও পাতনে প্রেম, প্রতীক্ষা বা সংশয়। ললিতছন্দে শরীরী এক অনন্য রূপভাবনা।

পৃথিবীর সর্বত্রই আদিম মানুষের নৃত্য, গীত ও জীবনযাত্রা প্রণালীর বিস্ময়কর সাদৃশ্য দেখা যায়। করতালি দিয়ে, মাথা ও অঙ্গচালনা করে, বন্যপত্ত ও প্রকৃতির অনুকরণ করে ভাষাসৃষ্টির আগেই আদিম মানুষ নাচগানের মাধ্যমে ভাবপ্রকাশ করত। হাম্বলি বলেছেন:

“Dance were also performed for sex-attraction, selection of bride or bridegroom, along with songs which were mostly sung gutturally first, and then in much higher key. These dances were mostly in imitation of the movements of the wild animals, and songs were reproduced in imitation of the notes of the birds and animals.”

(W.D. Humbly: The Tribal Dance) ভাবপ্রকাশের এই আদিম রূপটিকে অনুসরণ করে এবার নন্দিকেশ্বর-এর একটি শ্লোক বিচার করা যাক।

“আস্যেনালম্বয়েদ্ গীতং হস্তেনার্থং প্রদর্শয়েৎ।
চক্ষুর্ভ্যাং দর্শয়েদ্ভাবং পাদাভ্যাং তালমাদিশেং।।
যতো হস্তস্ততো দৃষ্টির্যতো দৃষ্টিস্ততো মনঃ।
যতো মনস্ততো ভাব যতো ভাবম্ভতো রস।।”
(অভিনয় দর্পণ : ৩৫-৩৭)

অর্থাৎ মুখের দ্বারা গান অবলম্বন করা উচিত, হস্তের দ্বারা অর্থ প্রদর্শন, চক্ষুর দ্বারা ভাব প্রকাশ এবং পদদ্বয়ে তাল রক্ষা করা উচিত। যেখানে হস্ত সেখানেই দৃষ্টি, যেখানে দৃষ্টি সেখানেই মনে গতি, যেখানে মন সেখানেই ভাব, আর যেখানে ভাব সেখানেই রসোৎপত্তি।

আদিম নৃত্যের রূপ এবং পরবর্তীকালে উন্নত সংস্কৃতির যুগের শাস্ত্রকার-এর এই ব্যাখ্যা থেকে পরিস্কারভাবে বোঝা যায় যে হস্তমুদ্রা ও অঙ্গকর্ম-এর ভাষার ভূমিকা গ্রহণ করার সূচনা আদিম মানুষের আচরণের মধ্যেই নিহিত ছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নৃত্য পদ্ধতিতে আঙ্গিক পার্থক্য থাকলেও তার একটা সার্বজনীন রূপ আছে। পার্থক্য যতোই থাক তা ভাষার মতো দুর্বোধ নয়। মূল ভাবটিকে সহজেই চেনা যায়, বোঝা যায়।

মুদ্রা শব্দের সাধারণ অর্থ শীলমোহর। হিন্দী ভাষায় মুদ্রা ও মুদ্রা, খস্ ভাষায় মুনরো, সিন্ধি ভাষায় মুন্সী, পালি ভাষায় মুদ্দা প্রচলিত। কেউ কেউ বলেন, অসিরিয় ভাষা মুসরূ থেকে মুদ্রা শব্দের সৃষ্টি হয়েছে। অশোকনাথ শাস্ত্রী বলেছেন, “নর্তনকলায় যে সকল হস্তভঙ্গী প্রদর্শিত হইয়া থাকে সাধারণতঃ সেগুলিকে মুদ্রা নামে অভিহিত করা হয়।

কেবল নর্তন ও নাট্যাভিনয় কেন-পৌরাণিক ও তান্ত্রিক উপাসনায়ও এই প্রকার দেবপ্রীতিকর নানারূপ হস্তভঙ্গী (মুদ্রা) ও দেহভঙ্গী ব্যবহৃত হইয়া থাকে। নর্তনমুদ্রা ও উপাসনা মুদ্রার মধ্যে ব্যবহারিক রূপভেদ থাকিলেও উভয়ের মূলস্বরূপে কোন পার্থক্য নাই। মূলত: এই উভয় শ্রেণীর মুদ্রাই সাঙ্কেতিক মূক ভাষা মাত্র।”

(অভিনয় দর্পণ অশোকনাথ শাস্ত্রী সম্পাদিত-ভূমিকা)

নৃত্যভাষা

নৃত্যের ভাষা বা হস্তমুদ্রা সম্পর্কে শাস্ত্রকারগণ বিশদ আলোচনা করেছেন। ভাষার মতো মুদ্রাপদ্ধতিতেও এসেছে ব্যাকরণের বন্ধন। Dr. Jean Przylaski তাঁর আলোচনায় (Mudra-Indian Culture, Vol.II, April 1936) এ প্রসঙ্গে বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে মাঙ্গলিক ধর্মানুষ্ঠান ও আভিচারিক কর্মে মুদ্রা শব্দে হস্তভঙ্গী বোঝায়।

‘নারদ পঞ্চরাত্র’ গ্রন্থে তৃতীয় অধ্যায়ে চব্বিশটি বিভিন্ন মুদ্রার উল্লেখ আছে। বৈদিক যুগে ও বৈদিকোত্তর সাহিত্যে মুদ্রা শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়। বাজসনেয় প্রাতিশাখ্য (১/১/২১) পানিনীয় শিক্ষার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেছেন :

“Going back to the Vedic times, however, one finds the word and the gesture on one plane, and being giving the same magical or religious importance.”

যাজ্ঞবল্ক্য শিক্ষা ও অন্যান্য বৈদিক সাহিত্যেও মুদ্রার বিবরণ পাওয়া যায়। হিন্দু বৌদ্ধ উভয় তান্ত্রিক অনুষ্ঠানেই মুদ্রার ব্যবহার দেখা যায়। ‘মঞ্জুশ্রী মূলকল্প’ গ্রন্থে মুদ্রার উল্লেখ আছে।

এই অঙ্গাভিনয় বা ভাষাপ্রকরণ সম্পর্কে বিভিন্ন শাস্ত্র গ্রন্থে বিস্তৃত আলোচনা আছে। নাট্যশাস্ত্রকে মূলগ্রন্থ হিসাবে গণ্য করে পরবর্তীকালে বহু শাস্ত্র রচিত হয়েছে। লক্ষ্য করা যায় যে পরবর্তীকালে বহু অঙ্গকর্ম যা নাট্যশাস্ত্রে নেই, শিল্পের প্রয়োজনে সংযোজিত হয়েছে। এর ফলে ভাষা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।

নাট্যশাস্ত্রে চব্বিশটি অসংযুক্ত হস্তমুদ্রা, তেরটি সংযুক্ত হস্তমুদ্রা এবং সাতাশটি নৃত্যহস্ত—মোট চৌষট্টি হস্তের উল্লেখ পাওয়া যায় (নাট্যশাস্ত্র ৯/১-২০০)। সঙ্গীত রত্নাকরে চব্বিশটি অসংযুক্ত, তেরটি সংযুক্ত এবং ত্রিশটি নৃতাহত্তের উল্লেখ আছে। (সঙ্গীত রত্নাকর/নর্তনাধ্যায়/৭৮খ-২৮২)।

এছাড়া নিকুঞ্চক, দ্বিশিখর ও বরদাভয় এই তিনটি নৃত্যহস্তের উল্লেখও সঙ্গীত রত্নাকরে আছে। অভিনয় দর্পণে আটাশটি অসংযুক্ত, তেইশটি সংযুক্ত ও পাঁচটি নৃত্তহস্তের উল্লেখ আছে। এছাড়া দেবহস্ত, অবতার হস্ত, গ্রহ-তারা হস্ত, বান্ধব হস্ত প্রভৃতি পাওয়া যায় (অভিনয় দর্পণ সম্পাদনা : মনোমোহন ঘোষ ৮৭-২৫৮)।

The Mirror of Gesture’ গ্রন্থে আটাশটি অসংযুক্ত, চব্বিশটি সংযুক্ত (আর একটি পুঁথি অনুসারে সাতাশ), এবং জলজ প্রাণী, নদী, সাগর, বন্য পশু, পক্ষী, বৃক্ষ, সপ্তলোক, দেবতা, বান্ধব প্রভৃতির অভিজ্ঞানসূচক মূদ্রার উল্লেখ পাওয়া যায় (The Mirror of Gesture: Ananda Coomarswamy p.27-51)

নাট্যশাস্ত্র, অভিনয় দর্পণ, সঙ্গীত রত্নাকর, সঙ্গীত দামোদর, হস্তরত্নাবলী, হস্তলক্ষণ দীপিকা, নাট্যশাস্ত্র সংগ্রহ, বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ, The Mirror of Gesture, নর্তন নির্ণয়, নাট্যলক্ষণ রত্নকোষ, নাট্যদর্পণ, অগ্নিপুরাণ, মানসোল্লাস, নৃত্য রত্নকোষ, নাট্য মনোরমা, সঙ্গীত নারায়ণ, সঙ্গীত মুক্তাবলী, অভিনয় দর্পণ প্রকাশ, সঙ্গীতকৌমুদী, সঙ্গীত কল্পলতা, নৃত্য রত্নাবলী, সঙ্গীত সার সংগ্রহ, সঙ্গীত সময়সার, সঙ্গীত মকরন্দ প্রভৃতি গ্রন্থে প্রকাশের সম্পূর্ণতা ও সৌন্দর্য সাধনের জন্য মুদ্রাগুলির বিভিন্ন প্রয়োগের পরিচয় পাওয়া যায়। সমস্ত নাট্যগ্রন্থ গুলির পর্যালোচনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ মুদ্রা অভিধান সংকলন করা একান্ত প্রয়োজন।

উল্লিখিত গ্রন্থাবলী অনুসারে মুদ্রাগুলির একটি মোটামুটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেওয়া হল।

 

ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ৭ [ Bharatnatyam Hasthamudra 7 ]
ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ৭ [ Bharatnatyam Hasthamudra 7 ]

 

অসংযুক্ত হস্ত মুদ্রার তালিকা [ নৃত্যভাষা ]

(১) অঙ্কুশ (২) অর্ধচন্দ্র (৩) অর্ধপতাক (৪) অর্ধসূচী (৫) অরাল (৬) অলপদ্ম (৭) অলপল্লব (৮) উৎকরাল (৯) উর্ণনাভ (১০) কটক

(১১) কপিখ (১২) কদম্ব (১৩) কর্তরীমুখ (১৪) কাকতুও (১৫) কাঙ্গুল (১৬) কামূলক (১৭) কুবল (১৮) কৃষ্ণসারমুখ (১৯) কটকামুখ (২০) খড়গাস্য

(২১) গোমুখ (২২) চতুর্মুখ (২৩) চতুর (২৪) চন্দ্রকলা (২৫) তন্ত্রীমুখ (২৬) তাম্রচূড় (২৭) ত্রিপতাক (২৮) ত্রিমুখ (২৯) ত্রিশূল (৩০) দ্বিমুখ

(৩১) ধৃতহস্তক (৩২) নিকুঞ্চক (৩৩) পক্ষীরুত (৩৪) পঞ্চাশ্য (৩৫) পতাক (৩৬) পদ্মকোষ (৩৭) পরিক্রমা (৩৮) পল্লি (৩৯) পণিকা (৪০) ভ্রমর

(৪১) মনুরণ (৪২) ময়ূর (৪৩) মুকুল (88) মুষ্টি (৪৫) মৃগশীর্ষ (৪৬) রঙ্গার্ধক (৪৭) ভল্গুল (৪৮) বরাহমুখ (৪৯) ভালচন্দ্র (৫০) বিগ্রহ

(৫১) শিখর (৫২) শুকতুও (৫৩) সন্দংশ (৫৪) সপশীর্ষ (৫৫) সিংহাস্য (৫৬) সূচীমুখ (৫৭) হংসপক্ষ (৫৮) হংসাস্য।

 

ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ৮ [ Bharatnatyam Hasthamudra 8 ]
ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ৮ [ Bharatnatyam Hasthamudra 8 ]

 

সংযুক্ত হস্ত মুদ্রার তালিকা [ নৃত্যভাষা ]

(১) অঞ্জলি (২) অরেখা (৩) অবহিখা (৪) আসঙ্গ (৫) উৎসঙ্গ (৬) কটকাবর্ধন (৭) কপোত (৮) কর্কট (৯) কর্তরীস্বস্তিক (১০) কলস

(১১) কীলক (১২) কুর্ম (১৩) কৈবল (১৪) কটকাবর্ধমানক (১৫) খট্টিকাসন (১৬) (১৭) গজদন্ত (১৮) গরুড় (১৯) চক্র (২০) তিলক

(২১) দদুর (২২) ডোল (২৩) দ্বিশিখর (২৪) নাগবন্ধ (২৫) নিষেধ (২৬) পতাক স্বস্তিক (২৭) পাশ (২৮) পুষ্পপুট (২৯) ভেরুগু (৩০) মকর

(৩১) মৎস (৩২) মরাল (৩৩) যোগমুষ্টিক (৩৪) বহিস্তম্ভ (৩৫) বর্ধমানক (৩৬) বরাহ (৩৭) বৈষ্ণব (৩৮) শকট (৩৯) শঙ্খ (৪০) শিবলিঙ্গ

(8১) শৃ (৪২) সম্পুট (৪৩) সম্প্রসারী (88) সংজ্ঞায়িকা (৪৫) সারিনী (৪৬) সুনন্দ (8৭) স্বস্তিক

 

ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ১১ [ Bharatnatyam Hasthamudra 11 ]
ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ১১ [ Bharatnatyam Hasthamudra 11 ]

 

নৃত্ত হস্ত [ নৃত্যভাষা ]

(১) অর্ধরেচিত (২) অরাল কটকামুখ (৩) অলপদ্ম (8) অলপল্লব (৫) অবহিপ (৬) আবিদ্ধচক্র (৭) উত্তানবাংসিত (৮) উদ্বৃত্ত (৯) উন্নত (১০) উরোমণ্ডল

(১১) উরোপার্শ্বভোমণ্ডল (১২) উষন (১৩) উর্ধ্বমণ্ডল (১৪) ঊর্ধ্বপার্শ্ব মণ্ডল (১৫) করিহন্ত (১৬) কেশবন্ধ (১৭) কুঞ্চিত (১৮) গরুড় পক্ষ (১৯) চতুর (২০) জ্ঞানহস্ত

(২১) তলমুখ (২২) দণ্ডপক্ষ (২৩) দ্বিশিখর (২৪) নলিনী পদ্মকোশ (২৫) নিতম্ব (২৬) নিকুঞ্চক (২৭) পক্ষ প্রদ্যোতক (২৮) পক্ষ বাংসিতক (২৯) পল্লব (৩০) পার্শ্বমণ্ডল

(৩১) পার্শ্বধমণ্ডল (৩২) প্ৰকীর্ণ (৩৩) মুদ্রা (৩৪) মুষ্টিকম্বস্তিক (৩৫) রেচিত (৩৬) লঘুমুখ (39) লতা (৩৮) লতাননা (৩৯) লতাননামুখ (৪০) ললিত

(৪১) বরাভয় (৪২) বলিত (৪৩) বিপ্ৰকীর্ণ (৪৪) শীর্ষানুবলিত (৪৫) সুচীমুখ (৪৬) সূচীবিদ্ধ (৪৭) স্বস্তিক।

 

ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ১৭ [ Bharatnatyam Hasthamudra 17 ]
ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ১৭ [ Bharatnatyam Hasthamudra 17 ]

 

দেবহস্ত [ নৃত্যভাষা ]

(1) ব্রহ্ম (২) ঈশ্বর (৩) বিষ্ণু (8) সরস্বতী (৫)

পার্বতী (৬) লক্ষ্মী (৭) বিনায়ক (৮) সম্মুখ (৯) মন্মথ

(১০) ইন্দ্ৰ (১১) অগ্নি (১২) যম (১৩) নিতি (১৪)

বরুণ (১৫) বায়ু (১৬) কুবের।

 

ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ১৮ [ Bharatnatyam Hasthamudra 18 ]
ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ১৮ [ Bharatnatyam Hasthamudra 18 ]

 

দশাবতার হস্ত [ নৃত্যভাষা ]

(১) মৎস (২) কূর্ম (৩) বরাহ (৪) নৃসিংহ (৫) বামন

(৬) পরশুরাম (৭) রামচন্দ্র (৮) বলরাম (৯) কৃষ্ণ

(১০) কল্কি।

জাতি হস্ত [ নৃত্যভাষা ]

(১) রাক্ষস (২) ব্রাহ্মণ (3) ক্ষত্রিয় (৪) বৈশ্য (৫) শূদ্র।

বান্ধব হস্ত [ নৃত্যভাষা ]

(১) দম্পতি (২) মাতৃ (৩) পিতৃ (৪) শ্বশুর (৫) শত্রু (৬) দেবর (৭) ননদ (৮) জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ ভ্রাতা (৯) পুত্র (১০) পুত্রবধূ (১১) সপত্নী (১২) জামাতা।

নবগ্রহ হস্ত [ নৃত্যভাষা ]

(১) সূর্য (২) চন্দ্র (3) মঙ্গল (8) বুধ (৫) বৃহস্পতি (৬) শুক্র (৭) শনি (৮) রাহু (৯) কেতু।

সাগর হস্ত [ নৃত্যভাষা ]

(১) লবণ (২) ইক্ষু (৩) সুরা (৪) সপি (৫) দধি (৬) ক্ষীর (৭) লুক্কোেদক।

নদী হস্ত [ নৃত্যভাষা ]

(1) গঙ্গা (২) যমুনা (৩) কৃষ্ণা (৪) কাবেরী (৫) নর্মদা (৬) সরস্বতী (৭) তুঙ্গভদ্রা (৮) বেত্রবতী (৯) চন্দ্রভাগা (১০) সরযু (১১) সুবর্ণমুখী (১২) পাপনাশিনী।

সপ্তলোক হস্ত [ নৃত্যভাষা ]

(১) অতল (২) বিতল (3) সুভল (8) তলাতল (৫) মহাতল (৬) রসাতল (৭) পাতাল।

বৃক্ষ হস্ত [ নৃত্যভাষা ]

(১) অশ্বথ (২) কদলী (৩) নারী (8) পনস (৫) বিশ্ব (৬) বকুল (৭) বট (৮) অর্জুন (৯) হিস্তাল (১০) গ (১১) চম্পক (১২) খদির, (১৩) অশোক (১৪) শমী (১৫) আমলক (১৬) কুরুবক (১৭) কপিখ (১৮) কেতকী (১৯) শিংশপ (২০) নিম্ব (২১) পারিজাত (২২) তিম্বিনি (২৩) জম্বু (২৪) পলাশ (২৫) রসাল।

প্রাণী হস্ত [ নৃত্যভাষা ]

(১) সিংহ (২) ব্যাঘ্র (৩) বানর (৪) ভল্লুক (৫) মার্জার (৬) শশক (৭) কৃষ্ণসার মৃগ (৮) গিরিকা (৯) কর্কট (১০) সারমেয় (১১) উই (১২) অজ (১৩) গর্দভ (১৪) ষণ্ড (১৫) গাভী (১৬) শুক (১৭) সারী (১৮) পারাবত (১৯) পেচক (২০) চাতক (২১) কোকিল (২২) বায়স (২৩) সারস (২৪) বক (২৫) হংস (২৬) ভ্রমর (২৭) মণ্ডুক (২৮) চক্রবাক।

নৃপ ও বীর হস্ত [ নৃত্যভাষা ]

(১) হরিশ্চন্দ্র (২) নল (৩) সগর (8) পুরুরবা (৫) দিলীপ (৬) অম্বরীষ (৭) কান্তবীর্য (৮) রাবণ (৯) ধর্মরাজ (১০) অর্জুন (১১) ভীম (১২) নকুল (১৩) শিবি (১৪) যযাতি (১৫) সহদেব (১৬) ভগীরথ (১৭) নহষ (১৮) রঘু (১৯) দশরথ (২০) রামচন্দ্র (২১) ভরত (২২) লক্ষণ (২৩) শত্রুম (২৪) অজ

হস্তকরণ [ নৃত্যভাষা ]

(১) আবেষ্টিত (২) উদ্বেষ্টিত (৩) পরিবর্তিত (৪) বাবর্তিত। হস্তকরণ-এর ক্ষেত্রে ভরত নাট্যশাস্ত্রের সঙ্গে অন্য শাস্ত্রগুলির কোনো পার্থক্য নেই।

হস্তকর্ম [ নৃত্যভাষা ]

নাট্যশাস্ত্র অনুসারে কুড়িটি হস্তকর্মের পরিচয় পাওয়া যায়। অন্যান্য গ্রন্থ অনুযায়ী মোট সংখ্যা ত্রিশ।

(১) আহ্বান (২) উৎকর্ষণ (৩) উদ্ধৃতি (৪) ছেদন (৫) তর্জন (৬) তাড়ন (৭) বোলন (৮) দোলন (৯) ধ্ৰুৰ (10) ধুনন (১১) নগ্রহ (১২) পরিগ্রহ (১৩) প্রবৃত্তি (১৪) ভেদ (১৫) ভ্রম (১৬) শেক্ষণ (১৭) মোটন (১৮) থান (১৯) রক্ষণ (২০) বিকর্ষণ (২১) বিক্ষেপ (২২) বিরাতি (২৩) বিয়োগ (২৪) বিসর্গ (২৫) বৃত্তি (২৬) ব্যাকর্ষণ (২৭) সংশ্লেষ (২৮) স্ফোটন (২৯) নোদন (৩০) লালন।

হস্তক্ষেত্র [ নৃত্যভাষা ]

(১) পার্শ্ব (২) পুর (৩) উর্ধ্বশির (৪) পশ্চাৎশির (৫) অধোশির (৬) ললাট (1) কর্ণ (৮) বক্ষ (৯) নাভি (১০) কটীশীর্ষ (১১) উরুদ্বয় (১২) স্কন্ধ (১৩) পশ্চাৎপার্শ্ব (১৪) পুরঃশির।

হস্তপ্রচার [ নৃত্যভাষা ]

(১) অধোগত (২) অম্লগ (৩) অধোমুখ (8) অগ্রতম্বল (৫) অধস্তল (৬) রোগ (9) ঊর্ধ্বগ (৮) ঊর্ধ্বমুখ (৯) উত্তান (১০) এস্য (১১) পরাঙ্মুখ (১২) পার্শ্বগত (১৩) গ (১৪) ব (১৫) সম্মুখ (১৬) সম্মুখতন।

 

ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ১৯ [ Bharatnatyam Hasthamudra 19 ]
ভরতনাট্যম হস্ত মুদ্রা ১৯ [ Bharatnatyam Hasthamudra 19 ]

 

এছাড়া নৃত্যরত্নকোষ গ্রন্থে উপাধান, কদম্ব, আলিঙ্গন, কলাপ, লেখন, অঞ্জনা, চন্দ্রকান্ত, জয়ন্ত প্রভৃতি সংযুক্ত

ও অসংযুক্ত মুদ্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। শারীরাভিনয়-এর অন্যান্য অঙ্গকর্মগুলিরও সম্পূর্ণ তথ্য বিভিন্ন নাট্যশাস্ত্রে পাওয়া যায়।

ব্যাঘ্র, হস্ত, অর্ধসূচী হস্ত, কটক হস্ত ও পল্লি হস্ত প্রচলিত কিন্তু নাট্যশাস্ত্রে বা অভিনয় দর্পণে অসংযুক্ত মুদ্রা তালিকায় এদের উল্লেখ নেই।

ব্যাঘ্র

মৃগশীর্ষ হস্ত অবস্থায় কনিষ্ঠা ও অঙ্গুষ্ঠ নমিত করলে ব্যাঘ্র হস্ত হয়।

ব্যাঘ্র, ভেক, মর্কট, শুক্তি প্রভৃতি অর্থ প্রকাশে ব্যাঘ্র হস্তের প্রয়োগ হয়।

অর্ধসূচি

কপিখ হস্ত অবস্থায় তর্জনী ঊর্ধ্বে প্রসারিত করলে অর্ধসূচী হস্ত হয়।

অঙ্কুর, পক্ষীশাবক, বৃহৎ কীট প্রভৃতি অর্থ প্রকাশে অর্ধসূচী হস্তের প্রয়োগ হয়।

কটক

সন্দংশ হস্ত অবস্থায় মধ্যমা ও অনামিকা মিলিত হলে কটক হস্ত হয়।

আহ্বানের ভাব ও চলন বোঝাতে কটক হস্তের প্রয়োগ হয়। এই মুদ্রার শোকের পূর্ণ পাঠ পাওয়া যায়নি।

পল্লী

ময়ূর হস্ত অবস্থায় তর্জনীর পৃষ্ঠদেশ মধ্যমার সহিত যুক্ত হলে পল্লী হস্ত হয়।

অসংযুক্ত হস্তগুলি থেকেই সংযুক্ত হস্তের উৎপত্তি হয়েছে। নাট্যশাস্ত্র অনুযায়ী অঞ্জলি, কপোত, কর্কট, স্বস্তিক, কটকাবর্ধমান, উৎসঙ্গ, নিষধ, ডোল, পুষ্পপুট, মকর, গজদন্ত, অবহিথ ও বর্ধমান এই তেরটি সংযুক্ত হস্ত। অভিনয় দর্পণে সংযুক্ত হন্ত তালিকায় অঞ্জলি, কপোত, কর্কট, স্বস্তিক, ডোলা, পুষ্পপুট, উৎসঙ্গ, শিবলিঙ্গ, কটকার্ধন, কর্তরীস্বস্তিক, শকট, শঙ্খ, চক্র, সম্পুট, পাশ কীলক, মৎস, কূর্ম, বরাহ, গরুড়, নাগবন্ধ, খটা ভেরুগু–এই তেইশটি মুদ্রার উল্লেখ আছে।

অবশ্য নাট্যশাস্ত্রে এছাড়া আরো বিভিন্ন নৃত্যহস্তের উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার নাট্যশাস্ত্রে চতুঃষষ্টি হস্তের উল্লেখ দেখা যায়। এ বিষয়ে বিশেষ গবেষণা করে মুদ্রার একটি অভিধান সংকলন করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অবশ্য একাজ বিশেষ দুরূহ ও পরিশ্রম সাপেক্ষ।

সাধারণভাবে সংযুক্ত ও অসংযুক্ত মুদ্রা তালিকা ও লক্ষণ এইখানেই শেষ হল, কিন্তু এছাড়াও বিভিন্ন অর্থ প্রকাশক মুদ্রার উল্লেখ নাট্যশাস্ত্র, অভিনয় দর্পণ ও সঙ্গীত রত্নাকরে পাওয়া যায়। বিভিন্ন দেবদেবীর ভূমিকায় বিভিন্ন মুদ্রা প্রচলিত।

 

 

ব্রহ্মহস্ত :

বাঁ হাতে চতুর হস্ত ও ডান হাতে হংসাস্য হস্ত করলে ব্রহ্ম হস্ত হয়।

ঈশ্বরহস্ত :

বাঁ হাতে মুগশীর্ষ ও ডান হাতে ত্রিপতাক হস্ত করলে শম্ভু হস্ত বা ঈশ্বর হস্ত হয়।

বিষ্ণু হস্ত :

দুই হাতেই ত্রিপতাক হস্ত করলে তাকে বিষ্ণু হস্ত বলে।

সরস্বতী হস্ত :

ডান হাত সূচী ও স্বদ্ধের সমরেখায় বাঁ হাতে কপিখ হস্ত করলে সরস্বতী হস্ত হয়।

পার্বতী হস্ত :

বাঁ হাত অর্ধচন্দ্র অবস্থায় ঊর্ধ্বে ও ডান হাত অর্ধচন্দ্র অবস্থায় প্রসারিত করলে অভয়া ও বরদা রূপে পার্বতী হস্ত হয়।

লক্ষী হস্ত :

দুই হাতে কপিখ হস্ত অবস্থায় কাঁধের কাছে উত্তোলিত থাকলে লক্ষী হস্ত হয়।

বিনায়ক হস্ত :

বক্ষোদেশে দুই হাত কপিখ হস্ত অবস্থায় রাখলে বিনায়ক হস্ত বা গণেশ হস্ত হয়। 

যন্মুখ হস্ত :

বাঁ হাতে ত্রিশূল হস্ত ও ঊর্ধ্বে ডান হাতে শিখর হস্ত করলে যম্মুখ হস্ত বা কার্তিকেয় হস্ত হয়।

মন্মথ হস্ত :

বাঁ হাতে শিখর হস্ত ও ডান হাতে কটকামুখ হস্ত করলে মম্মথ হস্ত হয়।

ইন্দ্ৰ হস্ত :

দুই হাতে ত্রিপতাক স্বস্তিকাকারে রাখলে ইন্দ্র হস্ত হয়।

যম হস্ত:

বাঁ হাতে পাশ হস্ত ও ডান হাতে সূচী হস্ত করলে যম হস্ত হয়। যমরাজকে চতুর্ভূজ কল্পনা করা হয়।

অগ্নি হস্ত :

বাঁ হাতে কাঙ্গুল হস্ত ও ডান হাতে ত্রিপতাক হস্ত করলে অগ্নি হস্ত হয়।

বরুণ হস্ত :

বাঁ হাতে শিখর হস্ত ও ডান হাতে পতাক হস্ত করলে বরুণ হস্ত হয়।

বায়ু হস্ত :

বাঁ হাতে অর্ধপতাক হস্ত ও ডান হাতে অরাল হস্ত করলে বায়ু হস্ত হয়।

এগুলি ছাড়াও বিভিন্ন অবতার হস্ত, নবগ্রহ হস্ত ও কার্যানুসারে জাতি হস্তেরও বিভিন্ন মুদ্রা আছে। শুধুমাত্র মুদ্রা সম্পর্কেই স্বতন্ত্র গ্রন্থ ও অভিধান রচিত হওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের বিশেষ প্রয়োজনীয় মুদ্রাগুলির পরিচয় ও লক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

পতাক, স্বস্তিক, ডোলা হস্ত, অঞ্জলি, কটকাবর্ধন, শকট, পাশ, কীলক, কপিখ, শিখর, কুর্ম, হংসাস্য ও অলপদ্ম—এই তেরটিকে নৃত্যের উপযোগী প্রধান মুদ্রারূপে গণ্য করা হয়।

 

 

নৃত্যহস্তগুলির পাঁচটি প্রধান গতি যথা—ঊর্ধ্বগতি, অধোগতি, উত্তরাগতি, প্রাচীগতি ও দক্ষিণাগতি। পাদবিক্ষেপ অনুযায়ী এই গতি সঞ্চালিত হয়।

নাট্যশাস্ত্রে ও অভিনয় দর্পণে নৃত্যহস্তের সংখ্যা ও লক্ষণে পার্থক্য আছে। বিভিন্ন অর্থ প্রকাশে বিভিন্ন শাস্ত্রীয় নৃত্যধারার লক্ষণভেদে এই মুদ্রাগুলির প্রয়োগ হয়। ভারতীয় নৃত্যের ভাবসম্পদের গভীরতা, ব্যাপ্তি, সূক্ষ্মতা প্রকাশে পৃথক ঋষি, বর্ণ ও বংশসম্ভূত হস্ত মুদ্রাগুলির প্রতীকধর্মী প্রয়োগ, অধ্যাত্মভাব ও শিল্পপ্রতিভার সমন্বয়ের এক বিস্ময়কর নিদর্শন।

নন্দিকেশর সম্প্রদায় বহিরঙ্গের খুঁটিনাটির উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন এবং নাট্যধর্মী অভিনয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন। আঙ্গিকাভিনয় পর্যায়ে অভিনয়দর্পণ একটি মূল্যবান গ্রন্থ। সেইজন্যে এই মুদ্রালক্ষণগুলি অভিনয়দর্পণের শ্লোক অনুযায়ী বর্ণিত হয়েছে।

ভবস্তি নৃত্যহস্তানাং গতয়ঃ পঞ্চধা ডুবি।

ঊর্দ্ধাধরোত্তরা প্রাচী দক্ষিণা চেতি বিশ্ৰুতা ।

যথা স্যাৎ পাদবিন্যাসন্তথৈব করয়োরপি ॥২১৯৷

বামাঙ্গভাগে বামস্য দক্ষিণে দক্ষিণস্য চ।

কুৰ্য্যাৎ প্রচলনং হোতনৃত্যসিদ্ধান্তলক্ষণম্ ॥২২০॥

যতো হস্তস্ততো দৃষ্টির্যতো দৃষ্টিস্ততো মনঃ

যতো মনস্ততো ভাবো যতো ভাবন্ততো রসঃ ॥২২১।

বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থের তালিকা থেকে বোঝা যায় যে, ভাবপ্রকাশের মাধ্যম রূপে এই ভাষারীতি প্রয়োজন অনুসারে পরিপুষ্ট হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সঙ্গীত রত্নাকরে :

“অভিনেয় বস্তু অনন্ত বলিয়া (দিগ) দর্শনের আমি এই সত্তরটি হস্তমুদ্রার কথা বলিলাম। অন্যবিধ হস্তমুদ্রা অশেষ।”

(সঙ্গীত রত্নাকর : ডঃ সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অনূদিত-নর্তনাধ্যায়/২৬৮(খ)-২৯৬ (ক) পৃঃ৩৪৯)

নাট্যের বিভিন্ন পরিবর্তন-মুহূর্তগুলিকে ভাষারূপ দেবার জন্য বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনীয় সঞ্চারিণী মুদ্রা সৃষ্টি করার অধিকারও নিশ্চয়ই শিল্পী আচার্যদের আছে।

এই কথাটি নিয়ে হয়তো বিতর্কের ঝড় উঠতে পারে। কারণ দীর্ঘকাল ধরে এই শাস্ত্রচর্চা গুরুমুখী শিক্ষা প্রয়াসেই আবদ্ধ থেকেছে। শিল্পী ও আচার্যেরা বিভিন্ন আঙ্গিকে দক্ষ হলেও শিল্পের আবয়বিক ও আন্তররূপের বিশ্লেষণ, ইতিহাসের ধারা বা এর নন্দনতত্ত্ব সম্পর্কে সচেতনতার পরিচয় দিতে পারেননি। বরং অভ্যন্ত সঙ্গে নিজ নিজ কঠোর রক্ষণশীলতার সঙ্গে নিজ নিজ বংশানুক্রমিক শিক্ষা পদ্ধতিকে সংরক্ষণ করেছেন, যার ফলে এর প্রসার অবরুদ্ধ হয়েছে।

 

 

তাঁদের মতে এই অভিনয়রীতি দেবপ্রদত্ত। যা ব্রহ্মা ভরতমুনিকে দিয়েছেন, তার বাইরে আর কিছু নেই, আর মানুষের কোনো অধিকারই নেই তা পরিবর্তন করার। অথচ শাস্ত্রকারগণ কিন্তু অন্য কথাই বলেছেন। শাঙ্গদেব-এর কথা আগেই বলা হয়েছে।

নাট্যশাস্ত্রেও আচার্যগণকে শক্তি অনুসারে প্রয়োগ করার অধিকার দেওয়া হয়েছে (নাট্যশাস্ত্র/৪/৫৯)। তাছাড়া দক্ষতা ও অধিকার অনুসারে স্রষ্টা অনন্তকরণ সৃষ্টি করতে পারেন—এ কথাও শাস্ত্রে পাওয়া যায়। অর্থাৎ ভারপ্রকাশের জন্যে সবরকম অঙ্গাভিনয়ের সংযোজনের অধিকার দেওয়া হয়েছে।একম অঙ্গাভিনয়ের সংযোজনে

আদিযুগের অনুকরণাত্মক ভাবভঙ্গী থেকে শুরু করে বৈদিক যুগের ধ্যানমুদ্রার পথ ধরে শিল্পী আচার্যদের অনুশীলনে সমৃদ্ধ এই ভাষাশৈলী এক সময়ে রক্ষণশীল অনুদারতার বন্ধনে পথ হারাল। আধুনিক মানসের সঙ্গে রক্ষা করতে পারল তার যোগসূত্র সে রক্ষা করতে পারল না।

প্রতীয়মানের অনাবশ্যক উপদ্রব থেকে সত্যকে খুঁজে বের করা, সাধারণের সঙ্গে বিশেষকে যুক্ত করা, বৃহত্তর প্রবাহের মধ্যে অনন্যকে চিহ্ণিত করা—এই ভূমিকা পালন করে শিল্পের শুদ্ধসত্তাকে রক্ষা করে এই প্রকাশ মাধ্যম। গবেষণা ও বুদ্ধিগত চর্চার মাধ্যমে এই ভাষারীতিকে সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে—সমকালের শিল্প সাহিত্যের সঙ্গে তার আত্মীয়তা ঘটাতে হবে। তবেই গড়ে উঠবে এক আন্তর্জাতিক ভাষা। গড়ে উঠবে এক বিশ্বজনীন সাংস্কৃতিক মহামিলনের সম্ভাবনা।

আরও দেখুন:

“নৃত্যভাষা”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন