সুর এবং নাচের সঙ্গে সম্পর্ক

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় – সুর এবং নাচের সঙ্গে সম্পর্ক।যা “যুগ যুগব্যাপী নাচ” খন্ডের অন্তর্ভুক্ত।

সুর এবং নাচের সঙ্গে সম্পর্ক

 

সুর এবং নাচের সঙ্গে সম্পর্ক

 

নাচের সঙ্গে সম্পর্ক শুধুমাত্র ছন্দময়তা না উপরে উল্লেখিত শেষ মন্তব্য আমাদের নিয়ে এসেছে সুরেলা নাচ সহযোগের মধ্যে। নাচুয়েকে প্রশান্তি ও প্রাণবন্তভাবে বয়ে নিয়ে যায় হর্ষোল্লাসজনিত জগতে এমনকি শব্দের সঠিক অর্থের অতিশয় উত্তেজনার সঙ্গে যেটাই নাচের অতীব অন্তর্নিহিত মৌলিক উপাদান। অধিকন্তু যে সুরেলা সঙ্গতে, যা সব সময় সর্বপ্রথমে গাওয়া হত তার প্রবণতা ছিল নাচের থীম (বিষয়বস্তু) ও অঙ্গভঙ্গির যাদুর প্রয়োজনীয়তায় আধ্যাত্মিক সংযোগ সৃষ্টি করা।

এটাকে অবশ্যই আধুনিক পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তর্জমা করা যাবে না। এইরূপ গানের বাণীর সঙ্গে নাচের উপলক্ষ্য ও অর্থের সম্পর্কযুক্তির প্রয়োজন নাই। আন্দামানীয়দের শোক প্রকাশক নাচের জন্য কম্পোজ করা হয়েছে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন বিষয় যেটা শিকার সম্পর্কিত অথবা নৌকা তৈরীর জন্য যেখানে বালকদের সূচনা-নাচে সামুদ্রিক কচ্ছপের বিষয়বস্তু পছন্দ করা হয়।

মালাক্কার সাকাইগণ সংশ্লিষ্ট বিষয়বস্তুর পরিবর্তে এমনকি পর্বতের সিরিজ ও নদীর নাম আবৃত্তি করতে থাকে। অবশ্য প্রকৃত বিষয়বস্তুর বিকল্প হিসাবে যে অর্থহীন শব্দের সংমিশ্রণ ঘটান হয়েছে তার সম্পূর্ণ অবশ্যম্ভাবী ফল বিদেশী দূর্বোধ্য শব্দের প্রচলন। আন্দামানীগণের মৌলিক কৃষ্টি অন্যতম শ্রেষ্ঠ বলে বর্ণিত।

যেটা আমাদেরকে আদিম নাচের গানের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত করাবে।নাচের সঙ্গে সম্পর্ক এখানে সাধারণ নাচ সর্বদাই গানের সঙ্গে হয় এবং নাচের জন্য সমস্ত গান কম্পোজ করা হয়। সত্যি বলতে কি এখানে নাচের গান ছাড়া কোন গান নাই। সংযোগশীল ক্ষমতার ঐতিহ্যবাহী মিউজিকেরও অভাব আছে।

প্রত্যেকেই গান উদ্ভাবন করে এবং এমনকি শিশুগণ এই আর্টে দীক্ষাপ্রাপ্ত। যখন নৌকা অথবা ধনুক বাঁকান হয় অথবা যখন নৌকা বাওয়া হয় তখন আন্দামানীয়গণ আপন মনে রচনা করতে থাকে যতক্ষণ না সে সেটাতে পরিতৃপ্ত হয় তারপর সে পরবর্তী নাচে সেটাকে প্রচলিত করে।

তার মহিলা আত্মীয়-স্বজনই সমবেত নারীদের মধ্যে প্রথমে চর্চা করবে, গানের উদ্ভাবক নিজেই গানের নেতারূপে নাচে গান ধরবে এবং নারীগণ তার পুনরাবৃত্তিতে অংশ নিবে। যদি গানের অংশটুকু সাফল্য লাভ করে তবে তা তথ্য ভান্ডারে যোগ হয় আর যদি ভাল না হয় তবে বাতিল হয়ে যায়।

কেউ অন্য কারো গান গায় না। প্রতিদিনের ঘটনা নিয়ে শব্দ ব্যবহার হয় যেমন শিকার, নৌকা বাঁধা (তৈরী-অর্থে)। তারা ভানহীন, উদাহরণ স্বরূপ  “পোইও মাম গোলাটের ছেলে, জানতে চায় কখন আমার নৌকা তৈরী শেষ হবে, সুতারাং আমাকে অবশ্যই তাড়াহুড়া করতে হবে যতটুকু সম্ভব”।

সুর তিনটা কাছাকাছি সম্পর্কযুক্ত ধাপে সীমাবদ্ধ। কবিতার চরণের আবৃত্তিসুলভ হবার স্বাধীনতা আছে কিন্তু কোরাস বা ঐক্যতান কঠোরভাবে ছন্দবন্ধ । দ্রুত তালের কোয়াটার নোটগুলি নেয় এম এম=১৩২ যা সঙ্গত করা হয় হাতের তালিতে ও পদাঘাতে।

 

google news logo
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

যদিও বর্ণিত আছে যে প্রতিটি গান নাচের জন্য রচনা বা কম্পোজ করা হয় তা আর পরবর্তী কৃষ্টিতে সঠিক সত্য হয়ে উঠে না। নাচ এবং গান তথাপি খুবই ঘনিষ্ঠ থাকে। তারা প্রবৃত্তির সহজাত গতিতে একই ক্ষমতা থেকে উৎসারিত হয়— কেউ এটাকে সম্পূর্ণরূপে প্ররোচিত করে (ভাল ও মন্দ দুই অর্থে) স্বতঃসিদ্ধ সত্য বলতে।

কিন্তু যে ধারণা এর মধ্যে নিহিত তা তাৎপর্যময় হয়ে উঠবে শুধুমাত্র তখনই যখন নাচ ও গানের প্রয়োজনীয় ঐক্য বুঝবার ভিত্তি হিসাবে ব্যবহৃত হবে । যতই আমরা ব্যক্তি অথবা সমস্ত জনগোষ্ঠি, লোকজন এবং জাতির কথা বলি না কেন তাদের সুর এবং নাচ অবশ্যই সর্বদা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত; যেহেতু উভয়ের প্রবৃত্তি একই গতিপথের দৃঢ়মূলে আবদ্ধ ।

এই গতিপথের অনুসন্ধান হয়ত বা মিউজিকের ইতিহাসে নতুন পথ প্রদর্শন করবে। এইরূপ অনুসন্ধান বর্তমান কালে কঠিন, কারণ মিউজিক পুনঃপরিবেশন ছাড়া নাচ বর্ণনা করতে আদিম মানুষের হিসাব-তথ্য স্বাভাবতঃই সীমাবন্ধ।

অন্যদিকে সঙ্গীতবিদগণ নোট (নোটেশন) রেকর্ড করে নাচের গঠন আকৃতি ছাড়া, যেটা তার সঙ্গে সহযোগ হত। শুধুমাত্র উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হল বারটক, ডেন্সমোর এবং ফক্স ষ্টেঞ্জওয়ের অবদান কিন্তু শেষ পর্যালোচনায় এটা আমাদের কাছে বেশী পার্থক্য করে না যদিও নির্দিষ্ট নাচে নির্দিষ্ট সুর থাকে, কারণ আমরা নাচের অঙ্গভঙ্গি এবং জনসাধারণের মিউজিকের সাধারণ সম্পর্কের ব্যাপারে বেশী সচেতন।

ভন হর্ণবষ্টল এরই মধ্যে এই সাধারণ সম্পর্ক উল্লেখ করেছেন। তিনি লেখেন “ইন্ডিয়ান মিউজিকের ষ্টাইল অদ্ভুত ধরনের, না উন্নতির স্তরে না কৃষ্টির দিকে কিন্তু তার চেয়ে জাতির দিকে। এটা এই কারণের জন্য খুবই বৈশিষ্ট্যমন্ডিত যে, শুধুমাত্র একটা আমেজের বহিপ্রকাশ (বোয়াস ছাড়া প্রায় সমস্ত নৃ-তত্ত্ববিদ দ্বারা অজ্ঞাত) যা অঙ্গভঙ্গির পথে খুব সঠিক ভাবে জাতির পার্থক্য নির্ণয় করে ।

এটা শরীরবৃত্তের এত গভীরে শিকড় প্রথিত যে, হাজার হাজার বৎসর ধরে দৃঢ়ভাবে চলতে থাকে এবং প্রাকৃতিক প্রভাব ও কৃষ্টিগত পরিবেশ প্রতিরোধ করে এমনকি বর্ণসঙ্করত্ব থেকেও। এটা নাচের দেহভঙ্গিমা, ঢোলক বাদকের বাহুভঙ্গি এবং গায়ক ও বক্তার গলা ও মুখের ভঙ্গি”সমভাবে নির্দিষ্ট করে। হারবার্ট বলডাস এই জ্ঞান প্রথম প্রয়োগ করেন।

তিনি উত্তর-পূর্ব চ্যাকো জনগোষ্ঠীর “বন্য নাচের লাফ, প্রচন্ড ঝুনঝুনি ঘুরান এবং উচ্চস্বরে প্রচন্ড গান গাওয়া” নিয়ে এক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সমরূপ বৈশিষ্ট্যের অন্য একটি জনগোষ্ঠীর মানসিক ও দৈহিক প্রকৃতি তুলনা করেন। পারের জনগোষ্ঠীর নাচ হল “একটা দ্বিধাগ্রস্থ, সামনে পিছনে অলসভাবে চলা, তাদের বাজনা যন্ত্রের শব্দ কম ও অস্পষ্ট, তাদের ঢোল যদিও আচ্ছাদিত, তাদের বাঁশী কখনই বেজে উঠে না এবং এমনকি তাদের যুদ্ধের  সিঙ্গা খেলনা তুরী থেকে অল্প শব্দ করে- নাই কোন তাদের সুরে প্রাণবন্ত গভীর আগ্রহের ছাপ।

তাদের গান হাল্কা ও তালিকার বাইরে” । এখানে স্বাভাবিক বাহনের, প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের, সময়ের ও কন্ঠস্বরের শক্তির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সঠিকভাবে বুঝা যায় । তথাপি পর্যাপ্ত না। এমনকি সুরেলা গাঁথুনি মনে হয় লোকের দেহভঙ্গিমায় অভিভাজ্য বাঁধান হয়ে আছে।

 

সুর এবং নাচের সঙ্গে সম্পর্ক

 

আমরা দুই ধরনের সুরকে তুলনা করে দেখতে পারি  পূর্ব-পলেনেশিয়ার মারকুইসা দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম সাধারণ গানের একটা দলবদ্ধ পুরুষদের কণ্ঠে ঢোল সঙ্গত সহ হাততালি দিয়ে গাওয়া গান * (স্বরলিপি-১) এবং অপরটা উত্তর আমেরিকার জুঁইনদের * (স্বরলিপি-২)।

আরও দেখুনঃ

Leave a Comment