কুচিপুড়ী মুনরোচিরালা বেদান্তকৃষ্ণ

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় কুচিপুড়ী মুনরোচিরালা বেদান্তকৃষ্ণ , যা ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্য এর অন্তর্ভুক্ত।

কুচিপুড়ী মুনরোচিরালা বেদান্তকৃষ্ণ

অন্ধ্রে যে উচ্চমানের শিল্পীসুলভ দক্ষতা প্রাচীন যুগ থেকেই ছিল এর সাক্ষ্য আমরা খৃঃ পূঃ ২ শতাব্দীতে গঠিত অমরাবতীর মন্দিরের নৃত্যরতা অপ্সরীদের প্রস্তরমূর্তি ও ৫-৬ শতাব্দীতে অঙ্কিত অজন্তার প্রাচীরচিত্রগুলোতে পাই।

এছাড়া ৮, ৯ ও ১০ শতকের উৎকীর্ণ লিপিতেও আমরা উল্লেখ পাই বেশ কয়েকটি নাটকের যেগুলোর মধ্যে সংগীত, নাট্য, নৃত্য এ সবেরই প্রাচুর্য ছিল এবং সেগুলোকে ব্রাহ্মণ মেলা বা নাটুবা মেলা বলা হতো।

মধ্যযুগের প্রথমদিকে যখন বীর শিবের আরাধনা চলছিল এবং যখন শৈব রাজারা অন্ধ্রের অধিপতি ছিলেন, তখন নৃত্যত্ত ছিল পুরুষালী ও প্রাণবন্তু এবং নৃত্যনাট্যগুলোর বিষয়বস্তু ছিল শিবলীলা বা ‘যক্ষ গণ’

পরে যখন বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার হলো এবং রাজারাও এ ধর্ম বরণ করে নিলেন, তখন গীতি ও নৃত্যনাট্যগুলো বিষ্ণুলীলাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল এবং এগুলোকে ‘ভগবৎ’ মেলা; আখ্যা দেওয়া হলো ।

 

কুচিপুড়ী মুনরোচিরালা বেদান্তকৃষ্ণ

 

ইতিহাসে আমরা উল্লেখ পাই ১৫০২ এর ‘মচুপল্লী কৈফিয়ৎ’-এ যে বিজয়নগরমের অধিপতি ইম্মাদি বরস নায়কের সামনে এক দল নৃত্য ও নাট্যশিল্পী তাদের কলাবিদ্যা প্রদর্শন করেছিলেন। ১৬ শতকে যে নৃত্যনাট্য বেশ উন্নতমানের ছিল এ কথা আমরা সোমনাথ উল্লিখিত ‘পণ্ডিতারাধ্যা চরিৎ’-এ পাই।

আমরা তা ছাড়া আরও প্রমাণ পাই যে ১৬শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ‘পারিজাত-অপহরণ’ নৃত্যনাট্যটি স্বামী নারায়ণ তীর্থ রচনা করেছিলেন কুচেলপুরামে। এই জায়গাটিই অন্ধ্রের কৃষ্ণা জেলা অন্তর্গত আধুনিক কুচিপুড়ি। এখান থেকে এই নৃত্যশৈলী অন্ধ্রের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়েছে। স্বামী নারায়ণ তীর্থ, যার আরেকটি নাম ‘তীর্থ নারায়ণ যতি’, আরও বেশ কিছু রচনার জন্যও সুপরিচিত।

১৫৫০ খ্রীস্টাব্দে তিনি শ্রীকৃষ্ণ কর্ণমুর্খমের বিখ্যাত ‘লীলা সুখ’-এর উপরে কৃষ্ণলীলা তরঙ্গিণীর নাট্যরূপ দিলেন। এই নিবেদনের প্রথম পাঁচটি স্তবকই সবচেয়ে বিখ্যাত! এগুলোতে বালাগোপালের তরঙ্গম অর্থাৎ কৃষ্ণের বাল-লীলার বর্ণনা পাওয়া যায়। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে কলাবিদ্যার পৃষ্ঠপোষকতায় ছেদ পড়ল।

এই সময়ে তাঞ্জোরের তেলেগু নায়ক রাজারা তাদের সাম্রাজ্যে ললিতকলার, বিশেষ করে নৃত্যের নতুন কেন্দ্র স্থাপনে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। তাই এ হেন পরিস্থিতিতে অনেক কুচিপুড়ী নৃত্যশিল্পী তাঞ্জোরে গিয়ে নায়ক রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা স্বীকার করলেন।

এইভাবে ভগবৎ মেলা প্রচলিত হলো অচুতপুরমে (বর্তমান মেলাটুর) এবং তাঞ্জোরের রাজসভার দেবদাসীরাও কুচিপুড়ী গুরুদের কাছে নৃত্যশিক্ষা নিতে শুরু করল। এসব দেবদাসীরা যারা সাদীর নাট্য অভ্যাস করত, তারা বিশ্বাস করতে শুরু করল যে মুকাভিনয়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছতে হলে ভগবৎদের (অর্থাৎ কুচিপুড়ী গুরুদেব) কাছে শিক্ষা নিতে হবে।

১৪শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এবং ১৫শ শতকের প্রথম দিকে স্বামী সিদ্ধেন্দ্র যোগী নিয়ে এলেন কুচিপুড়ীতে নতুন প্রাণ এবং এই সময় হলো কুচিপুড়ী শাস্ত্রীয় নৃত্যধারার মধ্যে এক রোমান্টিক অর্থাৎ আবেগপ্রবণ ধারার সৃষ্টি। সিদ্ধেন্দ্র যোগীর অনুরোধের ফলে কুচিপুড়ীর প্রত্যেকটি ব্রাহ্মণ পরিবার স্বীকার করলেন যে তাদের ছেলেদের নৃত্যের দেবের কাছে উৎসর্গ করবেন।

‘ভামা কলাপম’ ও অন্যান্য উৎকৃষ্ট নৃত্যনাট্য রচনা করে সিদ্ধেন্দ্র যোগী কুচিপুড়ী নৃত্যশৈলীতে নিয়ে এলেন অমরত্ন এই ভাবে কুচিপুড়ী নৃত্য ব্রাহ্মণ পুরুষগণ দ্বারা পরিবেশিত ও সংরক্ষিত হয়ে তার স্বচ্ছ নিষ্কলুষ রূপে আমাদের কাছে নেমে এসেছে। অতীতে কুচিপুড়ী সত্যবহানা রাজাদেরও পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল।

এবং ধীরে ধীরে কুচিপুড়ী গ্রামটি অন্ধ্র প্রদেশের নৃত্যের কেন্দ্রস্থল হয়ে দাঁড়ালো। নৃত্যনাট্যে মহিলার ভূমিকা পুরুষ দ্বারা পরিবেশিত হতো এবং এসব পুরুষেরা এত দক্ষ ছিলেন যে তারা রাজসভায় দেবদাসীদের নৃত্য প্রায় বন্ধই করে দিলেন, কারণ মহিলারা এসব বংশানুক্রমে শাস্ত্রজ্ঞ ও নৃত্যজ্ঞ ব্রাহ্মণ নৃত্যশিল্পীদের সামনে নাচতে সাহস পেলেন না ।

প্রমাণ আছে যে কুচিপুড়ীর ভগবত্পুরা গোলকোণ্ডার নবাব আব্দুল হাসান তহনিশার সামনে এত উৎকৃষ্ট নৃত্য পরিবেশন করেছিলেন যে নবাব খুশি হয়ে তাদের তাম্যপত্র প্রদান করেছিলেন এবং এই পত্রের মাধ্যমে নৃত্যনাট্যকারী পরিবারগুলো সেই গ্রামটি পুরস্কার স্বরূপ পেলেন।

অবশ্য এই সঙ্গে এ কথাও বলা ছিল যে নৃত্যনাট্যে অংশগ্রহণকারীরাই কেবল সেবায়েত রূপে গ্রামের অংশীদার হতে পারবেন। এটি হলো ১৮৭৫ সালের ঘটনা । কুচিপুড়ী নৃত্যশৈলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এই নৃত্যধারা ভরতের নাট্যশাস্ত্র দ্বারা প্রভাবিত এবং ভরতের লিখিত শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুসারেই এটি এখনও নাচা হয়।

কুচিপুড়ী নৃত্যনাট্যগুলোই প্রাচীন সংস্কৃত শাস্ত্রীয় নাটকের একমাত্র বর্তমান সংস্করণ। এর মধ্যেই আমরা প্রাচীন ভারতের নাট্যধারার জীবন্ত রূপ পাই । প্রার্থনা বা স্তুতি দিয়েই নৃত্যনাট্যের শুরু, কারণ ভরতমুনি বলেছেন— “আমাদের পূর্বগামীদের ঐতিহ্যমণ্ডিত বাক্য মনে রাখতে হবে। স্তুতি ইত্যাদি সম্পূর্ণ করে নৃত্য শুরু করা যায়।’

স্তুতিটি পর্দার আড়ালে সুরের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়। বেশির ভাগ সময় ঋগ্বেদ থেকে বাছা স্তবক দিয়েই এই প্রার্থনা শুরু হয়। পর্দা সরানোর পর এক নর্তক দর্শকের সামনে আসেন। এনার মাথা ও শুড় ঠিক ঐশ্বর্যদাতা, বিঘ্ননাশক গণেশ বা ‘বিনায়ক’-এর মতো। শিল্পী এসে বিনায়ক কৌখুবম বা কবিত্বম নাচেন।

এই নৃত্যে আমরা সুস্পষ্ট নাটকীয় রেখা দেখতে পাই এবং পদ সঞ্চালনের মধ্যে আমরা তেলেগু নাট্য ‘দারাভু’র আভাসও পাই। নাটকের মধ্যমণি হচ্ছেন সূত্রধর যিনি পুরো নাটকটি ধারাভাষ্যের ও গানের মাধ্যমে দর্শকের সামনে তুলে ধরেন। ইনি একজোড়া মন্দিরা বা ‘তালম’ এর সাহায্যে তালও রাখেন।

সূত্রধর ও যন্ত্রীরা রঙ্গমঞ্চের ডান ধারে বসেন এবং অন্যান্য চরিত্ররা তাদের আবশ্যকতা অনুযায়ী আসা যাওয়া করেন। আমরা ‘ভামা কলাপম’ নৃত্যনাট্যটি একটু বিশ্লেষণ করে দেখি। এই নৃত্যনাট্যটির আরেকটি নাম ‘পারিজাত-অপহরণম’। এতে কৃষ্ণের স্ত্রী সুন্দরী, অহংকারী, রাগী সত্যভামার ভূমিকাটিই সবচেয়ে কঠিন।

এবং এই চরিত্রের চিত্রণেই আসল শিল্পীর পরিচয় ফুটে ওঠে বলে এটি রূপ দিতে সকলে ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে আসেন। পুরো নৃত্যনাট্যটিতে ৫টি চরিত্র : সত্যভামা রুক্মিণী, কৃষ্ণ, নারদ ও সখী। এটি সম্পূর্ণ রূপে পরিবেশিত করতে সাত থেকে দশ দিন লাগে। আধুনিক দর্শকদের রুচি অনুসারে অবশ্য এখন এটিকে তিন ঘণ্টার মধ্যে দেখানো হয়।

সত্যভামা প্রবেশ করেন। তার ঝোলানো বেণী সুসজ্জিত, অলংকার খচিত সিঁথিতে বহু মূল্যবান পাথর এবং সিঁথির গোড়ায় রত্নদ্বারা নির্মিত অলংকার ও দুই পাশে সূর্য ও চন্দ্রের প্রতীক হিসাবে আরও দুটি অলংকার। বেণীর গায়ের এবং নীচের অলংকারগুলো গ্রহ-তারাদের প্রতীক। সত্যভামা এখানে স্ত্রী, সম্পূর্ণ মানবজাতি এবং পৃথিবীর স্বরূপ।

কৃষ্ণ এখানে পুরুষ, ভগবান, মহাবিশ্বের প্রতিনিধি। বৈষ্ণব ধর্মের সার নিয়েই এই কল্পনা। ভক্তের ভগবানের জন্য অসীম আকাঙ্ক্ষাই এখানে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। বেণীটি একটি পর্দার ওপর দিয়ে ঝোলানো থাকে এবং কেবল মাথার ওপরের ভাগ ও বিনুনিটিই দেখা যায় । শিল্পী পায়ে ‘দারাবু’ নাচেন এবং এই সময়ে, প্রথা অনুসারে প্রতিদ্বন্দ্বিদের আহ্বান করেন।

আহ্বান জানানো হয় তাকে যে এই শিল্পীকে নৃত্যে, নাট্যে বা শাস্ত্র-সম্বন্ধে আলোচনায় হারাতে পারবে। কুচিপুড়ীতে এই ভূমিকার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী আজ অবধি পাওয়া যায়নি। কেবল একবার একজন আহ্বানে এগিয়ে এসেছিল কিন্তু দেখা গেল যে প্রতিদ্বন্দ্বি কুচিপুড়ী গুরুদের কাছেই শিক্ষা লাভ করেছিল। তাই এই ব্যক্তিকে অপরপক্ষ হিসাবে মেনে নেওয়া গেল না।

অতএব সভ্যভামা এখনও তার জুড়ি পায়নি। যদি প্রতিদ্বন্দ্বি জিতে যায় তাহলে সে সত্যভামার মুখ্য অলংকার- তার বেণীটি কেটে নিতে পারে। সত্যভামা একটি বর্ণম গাইতে গাইতে রঙ্গমঞ্চে এসে উপস্থিত হয়। এবং তারপর তার নির্দিষ্ট অংশ হিসাবে গান, কথা ও নৃত্যের প্রয়োগ করে।

 

আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

এই ভাবে প্রতিটি চরিত্রের আগমনের সময়ে তারও বিশেষ ভূমিকা আছে এবং তারপরে তারা কথা, ভাব, নৃত্য ও পদসঞ্চালনের দ্বারা নিজেদের ভাব প্রকাশ করে । ভরত মুনি নাট্যশাস্ত্রে বলেন— ‘গীত কণ্ঠের দ্বারা, ভাব নয়নের দ্বারা, এবং তাল পদসঞ্চালনার দ্বারা পরিবেশিত হবে।’ নৃত্যনাট্যের মাঝে মাঝে অলঙ্কারস্বরূপ আসে বিশুদ্ধ নৃৎ ও অভিনয়- ভিত্তিক নৃত্য।

এছাড়া হাসা কৌতুক চরিত্রটি তার হাসি ঠাট্টার মাধ্যমে নাটকীয় গম্ভীরতা মাঝে মাঝে হাল্কা করতে সাহায্য করে। এই কৌতুকের অংশের সময়ে মূল চরিত্রেরা কিছুক্ষণ জিরোনোর ও পোশাক বদলের সময়ও পান। নাট্যের শেষে চিরাচরিত ‘মঙ্গলম’ গাওয়া হয় এবং এর মাধ্যমে নাটকের সঠিক সমাধান হয় ।

এই নৃত্যের নিয়ম, প্রথা ও শৈলীর আলোচনায় এবার আসা যাক । পায়ের কাজের মাধ্যমে পরিবেশিত আদাভু এই নৃত্যের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এবং এগুলোর সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘জেথি’ যেগুলো ছন্দের সমূহ । এগুলো আকারে ছোট এবং বড় দুইই হয় ।

আদাভু ও জেথির দ্বারা গাঁথা এবং বিভিন্ন তাল ও অঙ্গসঞ্চালনের মাধ্যমে পরিবেশিত অংশকে বলা হয় ‘থিরমনাম’। আদাভু বা পায়ের কাজে আমরা স্থিতি প্রধান ‘স্থায়ী’ ও গতিশীল ‘চারী’ পাই। এই তিনের সংযোগ নৃৎ পরিবেশিত হয়।

অভিনয় চার প্রকারের :

আঙ্গিক : শরীরের নানা ভঙ্গি ও সঞ্চালনের মাধ্যমে ভাব প্রকাশ পায় ।

বাচিক : কথা, গান বা বাক্যের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়।

আহার্য : পোশাক ও সাজ সজ্জার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

সাত্ত্বিক : মানসিক চিন্তা ও ভাবের বহিপ্রকাশ যেটি মুখের, বিশেষ করে চোখের, দ্বারা পরিবেশিত হয। মুখের মধ্যে ৯টি মূল ভাব বা বস প্রকাশ পায়। এগুলো হলো শৃঙ্গার, বীর, করুণ, অদ্ভুত, হাস্য, ভয়ানক, বীভৎস, রুদ্র ও শান্ত ।

হস্তের সঞ্চালনের সঙ্গে ভাবেরও সম্পর্ক আছে। ভরত মুনি এক মুল নিয়ম করেছেন—

‘যথা হস্ত, তথা দৃষ্টি,

যথা দৃষ্টি, তথা মন,

যথা মন, তথা ভাব

এবং যথা ভাব তথা রস’।

এ থেকে আমরা বুঝি যে ভাব এবং রসের অনুভূতির মধ্যেই সার্থক কলা বিদ্যার সন্ধান পাওয়া যায়। অভিনয়ের এসব উপাদান, নানা অঙ্গভঙ্গিমা, তাল ও লয়-এসবের সংযোগে নৃৎ, নৃত্য ও নাট্যের রূপ গঠিত হয়। এই থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে যুগ-যুগান্ত ধরে অন্য সব কলাবিদ্যা, যেমন চিত্রাঙ্কণ, ভাস্কর্য এবং পটশিল্প ।

নৃত্যনাট্যের মধ্যে অলংকার স্বরূপ আসে নৃৎ, নৃত্য ও নাট্য। সেগুলো নৃত্যনাট্যকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। কুচিপুড়ীর প্রধান অবদান কি? এ প্রশ্নের উত্তর বলা যেতে পারে যে এই নৃত্যধারা দক্ষিণ ভারতের নৃত্যজগতে নিয়ে আসে অভিনয়ের মহিমা, কারণ কুচিপুড়ীর ভাগবতুলুরা সকলে অভিনয় বিদ্যায় দক্ষ ছিলেন। ভাব ও তালকে আশ্রয় করে তারা নানা চিন্ত।,

ব্যঞ্জনা, অনুভূতি প্রকাশ করতে পারতেন- ভঙ্গি, চোখ ও মুদ্রার মাধ্যমে। যদিও অভিনয়ের বিষয়বস্তু কোনোভাবে সীমিত নয়, তবুও প্রথা অনুসারে শৃঙ্গার রস ভিত্তিক অভিনয়ই বহুদিন ধরে চলে আসছে। এর দুটি প্রধান কারণ আছে। সব বিদ্যাই ভগবৎদত্ত এবং এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জীবাত্মাকে পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত করা।

মানব- আত্মা সব সময় এইড পরমাত্মার সঙ্গে যোগসূত্র খুঁজছে এবং এই মিলন ভক্তির দ্বারাই সম্ভব। এই ভক্তির প্রকাশ নানা ভাবে হয় এবং এর মধ্যে অন্যতম জীবন-আত্মার নায়কী বা প্রেমিকা রূপে পরমাত্মা বা নায়ক বা প্রেমিকের কাছে এসে আত্মহারা হয়ে যাওয়া। প্রেমভিত্তিক সব গানগুলোই গভীরভাবে দেখলে এই ভাবেরই বাহন হিসাবে দেখা যায়।

অভিনয়ের জন্য রচিত গান সবই এই কথা মনে রেখে তৈরি করা হয়েছে। তাছাড়া, গান লেখার সময় একথাও মনে বাখা দরকার যে এগুলো শুধু যেন গান হিসাবেই উৎকৃষ্ট না হয়, এর মাধ্যমে যেন অভিনয় ও নৃত্যও দেখানো যায় । দক্ষিণ ভারতের নৃত্য সম্বন্ধে যারা ওয়াকিবহাল তারা ভরতনাট্যম ও কুচিপুড়ীর সাদৃশ্যের কথা বলবেন।

এই সাদৃশ্যটি অস্বীকার করা যায় না। কারণ ভরতনাট্যমে কোনো জীবন্ত নৃত্যধারা নয়, এটি একটি রীতি বা শৈলী বিন্যাস যেটি চারটি প্রধান নৃত্যে প্রকাশ হয়- সাদির নাট্য, কুরুবাঞ্জী, ভগবৎ মেলা নাটক ও কুচিপুড়ী।

 

কুচিপুড়ী মুনরোচিরালা বেদান্তকৃষ্ণ

 

সঙ্গীতই কুচিপুড়ীর কেন্দ্রমণি। কর্ণাটিক শৈলীতে আবহ সংগীত পরিবেশিত হয়। ‘নাট্যম’ হলো এই সংগীতের দর্শনীয় রূপ বা মূর্তি । কুচিপুড়ী আমাদের চোখ, কান, বুদ্ধি থেকে শুরু করে হৃদয় অবধি স্পর্শ করে।

ভারতে নৃত্যকে আমরা হাল্কা নেশা বা প্রমোদের উপাদান হিসেবে দেখি না। যদিও এ দেশে নৃত্য সামাজিক ও ঐহিক কারণে প্রদর্শিত হয়েছে, তাও এর মূল উদ্দেশ্য সর্বদাই আধ্যাত্মিক। আমরা রুক্মিণী দেবী অরুন্ডেলের বাণী থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে পারি— ‘ভারতে নৃত্য হলো এক মহাযোগ, যেখানে তপস্যা আত্মার উৎকর্ষ নিয়ে আসে।’

এর থেকে আমরা সচেতন হয়ে উঠি এবং আমাদের দিব্য জ্ঞান ও অনুভূতির মাধ্যমে জীবাত্মা পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের পথে এগিয়ে চলে। মহাযোগী নটরাজ শিবের নৃত্যের সঙ্গে যোগও গুরুত্বপূর্ণ।

নৃত্যশিল্পীর নৃত্যের ও জীবনের সব আশা আকাঙ্খা নটরাজের চিরন্তন দিবানৃত্যের উপরে কেন্দ্রীভূত হলে তখনই সে নটরাজের দিগ্বিজয়ী ‘আনন্দ-তাণ্ডব’ নৃত্য অনুভব করতে পারে ।

 

আরও দেখুনঃ

Leave a Comment