ওড়িশি নৃত্য অলকা কানুনগো

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় ওড়িশি নৃত্য অলকা কানুনগো , যা ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্য এর অন্তর্ভুক্ত।

ওড়িশি নৃত্য অলকা কানুনগো

এক সময়ে উন্নত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যমণ্ডিত শাস্ত্রীয় প্রথাসম্মত এক নৃত্যশৈলী ধ্রুপদী নৃত্য হিসেবে স্বীকৃত হয়নি, বর্তমানে সেই নৃত্যধারাই খুবই জনপ্রিয় এবং একটি অন্যতম ধ্রুপদী নৃত্য হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এটা সম্ভব হয়েছে কেবলমাত্র নিবেদিতপ্রাণ গুরু ও শিষ্যের সমবেত প্রচেষ্টা এবং কঠোর পরিশ্রমে। আমরা ওড়িশি নৃত্য প্রসঙ্গেই এই আলোচনার অবতারণা করছি।

এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আছেন উড়িষ্যার কবিচন্দ্র কালিচরণ পট্টনায়ক, ধীরেন্দ্র পট্টনায়ক, জীবন পানি, নীলমাধব বোস এবং ভিন্ন প্রদেশের মোহন খোকর এবং চার্লস ফেব্রি। গুরুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কেলুচরণ মহাপাত্র, পঙ্কজচরণ দাস, মায়াধর রাউত, রঘুনাথ দত্ত, স্বর্গীয় দেবপ্রসাদ দাস এবং দয়ানিধি বেহেরা।

ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যের মানচিত্রে ওড়িশি নৃত্য স্থান পেয়েছে এদেরই অক্লান্ত প্রচেষ্টায়। যেসব নৃত্যশিল্পী এই নৃত্যকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন এবং বিশ্বের সর্বত্র এই নৃত্যের প্রচার করেছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সংযুক্তা পাণিগ্রাহী, মিনতি মিশ্র, ইন্দ্রাণী রহমান, কুঙ্কুম মহান্তি এবং প্রথম পথিকৃৎ ছিলেন প্রিয়ম্বদা মহান্তি।

যেসব নিবেদিত প্রাণ সংগীতজ্ঞের সহায়তা ব্যতীত এই প্রচেষ্টা কিছুতেই সার্থক হতে পারত না তারা হলেন ভূবনেশ্বর মিশ্র, বালকৃষ্ণ দাস এবং রঘুনাথ পাণিগ্রাহী । উড়িষ্যা দেশের নামেই ওড়িশি নৃত্য পরিচিত এবং নাট্যশাস্ত্রানুসারে প্রাচীন নাম ওড্র দেশ থেকেই এর উৎপত্তি।

 

ওড়িশি নৃত্য অলকা কানুনগো

 

নৃত্য ও নাটক সম্পর্কিত প্রামাণ্য গ্রন্থ ভরতের নাট্যশাস্ত্রে চার প্রাদেশিক শৈলীর নৃত্যধারার কথা আছে— অবন্তী, দাক্ষিণাত্য, পাঞ্চালী এবং ওড্র, মাগধী। অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, বাসা, ওড্র, পুন্ড্র এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলের আরও কিছু কিছু স্থানে ওড্র মাগধী নৃত্য প্রচলিত ছিল বলে মনে করা হয়। এর মধ্যে কলিঙ্গ এবং ওড্র বর্তমান উড়িষ্যার অন্তর্গত।

সুতরাং খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকেই উড়িষ্যায় শাস্ত্রীয় নৃত্যধারা প্রচলিত ছিল বলে সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে। বিভিন্ন শিলালিপি এবং ভাস্কর্যশিল্প থেকেও এই নৃত্যের প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে নিঃসন্দেহে হওয়া যায়। খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে রাজা খারবেল নির্মিত জৈনমঠ উদয়গিরির হাতিগুম্ফা গিরিগুহায় উড়িষ্যার প্রাচীনতম নৃত্যগীতের প্রামাণ্য ভাস্কর্য দেখা যায়।

এই গুহাচিত্র থেকে এটা স্পষ্ট বোঝা যায় যে, রাজা খারবেল সাধারণ জনগণের চিত্তবিনোদনের জন্য দক্ষ শিল্পীদের দিয়ে সংগীত নৃত্য নাটক প্রদর্শনের ও সংগঠনের ব্যবস্থা করেছিলেন।

উদয়গিরির রানীগুম্ফার দক্ষিণ দিকের চিত্রে দেখা যায় একটি চিত্রে বৃক্ষকে কেন্দ্র করে একদল সংগীতরত ও নৃত্যরত নারী-পুরুষ, তাদের যন্ত্রানুষঙ্গে দেখা যায় প্রধানত বীণা, মাদল, বাঁশি এবং করতাল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো ভারতের নৃত্য সম্বন্ধীয় ভাস্কর্যের প্রাচীনতম নিদর্শন।

নাট্যশাস্ত্রের ভিত্তিতে পণ্ডিত এবং নাট্যকার ধীরেন দাস প্রমাণ করেছেন যে, রীনাগুম্ফা কেবলমাত্র জনগণ ও পণ্ডিতদের জন্য প্রচলিত মঠই ছিল না প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল নাট্যশালা। মন্দিরের স্থাপত্য চিত্রে প্রচুর নৃত্যভঙ্গিমাচিত্রের উপস্থাপনা থেকে বোঝা যায় যে উড়িষ্যাবাসীর জীবনের অন্যতম অঙ্গ ছিল নৃত্য।

ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত উড়িষ্যার বিভিন্ন স্থানে নির্মিত মন্দিরগাত্রে অপরূপসুন্দর নৃত্যশিল্পীদের ত্রিভঙ্গ শৈ বহু ভাস্কর্য চিত্র দেখা যায় । নৃত্যের বিভিন্ন ভঙ্গিমায়দেবদেবীগণের মধ্যে হেরুকা, মারিচি, বজ্রবরাহি অচলা এবং অপরাজিতার চিত্র দেখা যায়।

ভুবনেশ্বরে ভরতেশ্বর, শত্রুঘ্নেশ্বর, লক্ষণেশ্বর, পরশুরামেশ্বর, মুক্তেশ্বর, লিঙ্গরাজ ও রাজরানীর মন্দিরে এবং পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে বহু নৃত্যশিল্পীর খোদাই চিত্র আছে যে সব নৃত্যশিল্পীর কায়িক গঠনভঙ্গি সম্পূর্ণ শাস্ত্রানুসারী। কোনারকে নৃত্যের ভাস্কর্যশিল্প নিখুঁত সৌন্দর্যময়, অনুপম অদ্বিতীয় হিসেবে স্বীকৃত।

এই মন্দিরের বৃহৎ অট্টালিকাগাত্রের সর্বত্র ভাস্কর্যশিল্প ও খোদাইচিত্রপূর্ণ। সম্ভবত কোনারকই ভারতের একমাত্র মন্দির যেখানে গায়ক-বাদক-নৃত্যশিল্পী প্রভৃতি সংগীতবিদদের চিত্র বাস্তবজীবনের আকৃতি অপেক্ষা অতিকায় ধরনের। জগমোহনের ছাদের প্রাচীরে দণ্ডায়মান এই শিল্পীরা বীণা, বেণু, মাদল, কাহালি, করতাল প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র বাদনরত।

এখন এসব ভঙ্গিমা উড়িষ্যার বটু নৃত্যের অঙ্গ। পণ্ডিতগণের মতে বাস্তব মডেলনির্ভর হওয়ার জন্য এই ভাস্কর্য এত সূক্ষ্ম-সুন্দর। হিন্দু দর্শন অনুযায়ী ঈশ্বরের আরাধনা এবং নির্বাণ বা মুক্তিলাভের জন্য উপাসনার এক অন্যতম পদ্ধতি নৃত্য। বেশিরভাগ ভারতীয় নৃত্যকলার উদ্ভব ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান থেকে ।

হিন্দু মন্দিরে দেবতার কাছে নর্তকি দেবদাসীকে নিবেদনের প্রথা বহু প্রাচীন। শিব পুরাণেও তার সাক্ষ্য মেলে। কেশরী রাজাদের সময়কার ব্রহ্মেশ্বর মন্দিরের লিপি থেকে জানা যায় যে, খ্রীষ্টীয় নবম শতাব্দীর সমকালে উড়িষ্যার মন্দিরে দেবদাসীরা ছিলেন।

দ্বাদশ শতাব্দীতে ডোডগঙ্গাদেবের সময় থেকে উড়িষ্যার প্রধান দেবস্থানগুলোতে বিশেষত পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের এই প্রথা ছিল অপরিহার্য। বহু শতাব্দী ধরে রক্ষিত দৈনিক ঘটনাবলীর দলিল ‘মঙ্গল পাঁজি’ থেকেও এই প্রথার সমর্থন মেলে। এই মন্দিরের নর্তকিরা মাহারী নামে পরিচিত (অর্থাৎ মহান নারী)। মাহারীর মধ্যেই বর্তমান ওড়িশি নৃত্যের উৎস নিহিত।

তাই ওড়িশি নৃত্যের ইতিহাস একই সঙ্গে মাহারীর ইতিহাস। সুরবেশ্যা বা নাচুনি নামে পরিচিত মাহারী মূলত উড়িষ্যার মন্দিরের সেবায়েত বা নিয়োগ অর্থাৎ মন্দিরের ভৃত্যের সমপর্যায়ভুক্ত। এদেরকে চারটি শ্রেণীতে বিভাজন করা হয়- ভিতর নাচুনি, বাহার নাচুনি, ভিতর গাউনি এবং বাহার গাউনি।

রাজা কপিলেন্দ্রদেবের সময় থেকে মাহারীরা দিনে দুবার মন্দিরে নাচতেন; ভগবানের দ্বিপ্রাহরিক আহারকালে অথবা সকালে ধুপ বা ভোগ-এর সময়ে একবার এবং দ্বিতীয়বার সনঝা ধুপ বা শয়নের আগে দেবতার সজ্জাকালে।

সনঝা ধূপে মন্দিরের অভ্যন্তরে এই নৃত্য হতো এবং অন্তত তিনজন সংগীতবিদ সহায়ক থাকতেন— প্রধানত পাখোয়াজ বাদক, গায়ক এবং একজন মঞ্জীরা বাদক। রাজগুরু এই অনুষ্ঠানের দেখাশোনা করতেন এবং অনুষ্ঠানকালে নিজে উপস্থিত থাকতেন। তার হাতে থাকত স্বর্ণদণ্ড। মাহারী প্রথমে দেবতা ও তারপরে রাজগুরুকে প্রণাম করে নৃত্যের সূচনা করত।

দেবতার সঙ্গেই মাহারীর বিবাহ দেওয়া হতো। এই বিবাহের পরই মাহারী মন্দিরে নৃত্যের অধিকার পেত । এই প্রথা বজায় রাখার জন্য মাহারী শিশুকন্যা পালন করতেন এবং শৈশব থেকেই তাদের নৃত্যশিক্ষা দেওয়া হতো। কথিত আছে রাজা পুরুষোত্তম দেবের পত্নী রানী পদ্মাবতীও শ্রীজগন্নাথ মন্দিরে মাহারী ছিলেন।

প্রাচীন নথিপত্র থেকে জানা যায় যে মাহারীরা ছিলেন চরিত্রবতী সতী এবং তারা সম্মানজনক জীবনযাপন করতেন। রামচন্দ্রদেবের সময় থেকে মাহারীদের দেখাশোনা করার জন্য দুজন সেবায়েত নিযুক্ত হয়। এই সময়ে মাহারীদের কর্তব্য ও আচরণবিধি ছিল নির্দিষ্ট এবং কড়া নিয়মের নিগড়ে বাধা।

শ্রী সদাশিব রথশর্মার কাছে পাওয়া এক নথি থেকে জানা যায় যে, মাহারীদের পুরুষসঙ্গ করা নিষিদ্ধ ছিল। তারা তিলকসেবা করতেন ও তুলসীকাঠিও ব্যবহার করতেন। ঘরে তৈরি কোনো খাবার তারা খেতে পারতেন না। নাচের জন্য নির্দিষ্ট দিনে তারা কোনো পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন না এবং অনুষ্ঠানের সময়ে দর্শকদের প্রতি তাদের দৃষ্টিপাতও নিষিদ্ধ ছিল।

তাদের নৃত্য ছিল শাস্ত্রানুসারী এবং তালবদ্ধ। গীতগোবিন্দের পদগীতাবলীর সঙ্গে তাদের অভিনয়ও কাতে হতো। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ থেকে উড়িষ্যা স্বাধীনতা হারায় এবং ক্রমে ভোই, মুঘল, মারাঠা এবং অবশেষে ব্রিটিশের অধীন হয়। এই রাজনৈতিক অস্থিরতা সেই জায়গায় সাংস্কৃতিক জীবনেও প্রভাব বিস্তার করে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকেও জগন্নাথ মন্দিরে দিনে দুবার নৃত্যানুষ্ঠানের নীতি প্রচলিত ছিল। এই নৃত্যানুষ্ঠান ঠিক কবে থেকে বন্ধ হয়েছিল তা জানা না গেলেও ১৯৫০ সাল থেকে মন্দিরে নৃত্যের প্রতীকস্বরূপ পারিজা বা মুদ্রাসহযোগে গান হয়।

এখনো অবধি এই রীতি প্রচলিত আছে এবং এখানে তিনজন মাহারী জীবিত আছেন।‘খেই’ বা আহার্য ছাড়া বর্তমানের এই মাহারীরা মন্দির থেকে আর কিছুই পান না। সম্ভবত রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই মাহারীরা তাদের মর্যাদাচ্যুত হয়েছিলেন।

 

আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

মাহারীদের সম্পর্কে গবেষণা করে এবং তদের সঙ্গে কথা বলে ড. ফ্রেডরিক আপফেল মার্জলিন (Dr. Frederique Apffcl Marglin’ তার Wives of the God king’ গ্রন্থে লিখেছেন যে মাহারীদের সঙ্গে পাণ্ডাদের (মন্দিরের উপাসক বা ব্রাহ্মণ পুরোহিত) এবং রাজাদের কামজ সম্পর্ক ছিল। তৎকালীন সমাজে এটা প্রচলিত ছিল ।

সম্ভবত এই কারণেই ভোই রাজা রামচন্দ্র দেবের সময় থেকে গটিপুঅ বা পুরুষ নৃত্যশিল্পী দেখা যায়। তারা মন্দিরের ভিতরে নৃত্য প্রদর্শন করার অধিকারী ছিলেন না, মন্দিরের বাইরের প্রাঙ্গণই ছিল তাদের জন্য নির্দিষ্ট।

তারা জগন্নাথ মন্দিরে আচার-রীতি অনুষ্ঠানেই কেবল সহায়তা করতেন তা নয়, অনধিকার প্রবেশকারীর থেকে নগর এবং মন্দির রক্ষা করার কাজেও তারা নিযুক্ত ছিলেন। রামচন্দ্র দেব সাতটি পথ তৈরি করে এক এক পর্যায়ের সেবায়েতের জন্য এক একটি নির্দিষ্ট করেন। এই পথসমূহের একটি ছিল গটিপুঅর জন্য । নির্দিষ্ট পথটি পরিচিত ছিল ‘চাপ আখড়াপলি’ নামে।

সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকলাপের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে রামচন্দ্রদেব শরীরচর্চার জন্য ব্যায়ামাগারও তৈরি করেন। এই শরীরচর্চার কেন্দ্র গটিপুঅর শিক্ষণ বিদ্যালয় হিসাবেও নির্দিষ্ট ছিল। গটিপুঅ পদ্ধতি সূচনার জন্য আর একটি কারণও দেখান হয়।

কারণ রামানন্দ রায়ের পরবর্তীকাল থেকে বৈষবেরা নারীদের নৃত্যকে মেনে নেননি এবং তারা নিজেরাই সখীভাবে নৃত্য করতেন এবং বালিকা সাজিয়ে বালকদের দিয়েই নৃত্য করাতেন ।

গতিপুঅ আখজাপিলা নামেও পরিচিত ছিলেন। তারা ছিলেন পেশাদারী। রাজা এবং জমিদাররা ছিলেন এদের পৃষ্ঠপোষক। সাত বছর বয়স থেকেই এদের শিক্ষা শুরু হতো। মল্লক্রীড়াভিত্তিক বন্ধনৃত্য এরা শিখত।

কিন্তু গতিপুঅদের অভিনয় করতে হতো এবং গীতিকবিতার সঙ্গে গাইতেও হতো। কবিসূর্য, গোপাল কৃষ্ণ এবং বনমালীর গান তারা গাইতেন। নৃত্যের সঙ্গে যন্ত্রানুষঙ্গে ছিল পখোয়াজ, হারমোনিয়াম এবং মঞ্জীরা; পরে বেহালাও সংযুক্ত হয়। এই বালকেরা খুবই সুশৃঙ্খলভাবে শিক্ষা পেত এবং তাদের আহারাদির ব্যবস্থাও ভালো ছিল।

বর্তমানের কয়েকজন গুরু আগে গতিপুঅ ছিলেন। তারাই অতীতের ঐতিহ্যকে বজায় রাখতে সচেষ্ট হন এবং ওড়িশি নৃত্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়তা করেন। ধ্রুপদী নৃত্য হিসাবে ওড়িশি নৃত্য নন্দিকেশ্বরের অভিনয়দর্পণ, মহেশ্বর মহাপাত্রের অভিনয়চন্দ্রিকা (দ্বাদশ শতকে লিখিত অপ্রকাশিত গ্রন্থ) এবং ভরতের নাট্যশাস্ত্রের অনুসারী।

ওড়িশি নৃত্যের প্রধান বিষয় সৌন্দর্য এবং অনুপম ভঙ্গিমা যার পরিচয় উড়িষ্যার মন্দিরগাত্রে পাওয়া যায়। ওড়িশি নৃত্যের মূল পর্যায়ে চৌক এবং ত্রিভঙ্গি। চৌক হলো, চতুষ্কোণিক ভঙ্গিতে শিল্পী চারটি ভিন্ন কোণার রূপ দেন, বাঁধ, হাতে হাঁটুতে এবং পায়ে। যে রূপের সঙ্গে ওড়িশি সংস্কৃতির মহান দেবতা জগন্নাথের আকৃতির সাদৃশ্য আছে।

ত্রিভঙ্গিতে তিনটি ভঙ্গিমা নিতম্ব, কোমার ও মাথার বঙ্কিম ভঙ্গি দ্বারা উপস্থাপিত হয়। অন্যান্য ধ্রুপদী নৃত্যের মতো ওড়িশি নৃত্যেও কয়েকটি পর্যায় বিভাগ আছে যেমন— মঙ্গলাচরণ (প্রার্থনা), বোট্টু (সূচনা), পল্লভী (বিস্তৃতি), অভিনয় (নাট্যরূপায়ণ) এবং মোক্ষ (মুক্তি)। মঙ্গলাচরণ—ওড়িশি নৃত্যের প্রবেশক পর্যায়।

নৃত্যশিল্পীর মঞ্চে প্রবেশ করাকে ওড়িশিতে পাত্র প্রবেশ বা মঞ্চ প্রবেশ নামে অভিহিত করা হয়। এরপর নৃত্য যাতে সাফল্যমণ্ডিত হয় তার জন্য নৃত্যশিল্পী ভগবান জগন্নাথের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। নৃত্যানুষ্ঠানের সময় যে ধরিত্রীর উপর শিল্পী পদচারণা করবেন সেই মাতা ধরিত্রীকেও প্রণাম জ্ঞাপন করা হয়।

তারপর কোনো দেব বা দেবীর স্তুতি করা হয় শ্লোকের মাধ্যমে। সভা প্রণামের পর চূড়ান্তভাবে দেবতা, গুরু এবং দর্শকদের ত্রিখণ্ডি প্রণাম শেষে এই পর্ব সমাপ্ত হয়। বট্টু পর্যায়ে নৃত্যকালীন দেহ সঞ্চালনের যথার্থ বজায় রাখা হয় । এই নৃত্য পর্যায়ভুক্ত প্রকৃত বিশুদ্ধ নৃত্য যার মধ্যে অভিনয়ের কোনো সুযোগ নেই। সাধারণ ওড়িশি নবীন শিক্ষার্থীকে (বোট্টু বলা হয়।

কাঠের শিক্ষণ শেষে শিক্ষার্থী এই নামে পরিচিত হয়। অনেকের মতে বটুকেশ্বর ভৈরবের স্তুতিতেই এই পর্যায়, তাই এই পর্যায়ের নাম বোট্টু। যদিও এ দুটি মতের মধ্যে কোনো মিল নেই তবুও প্রথমটাই সাধারণত স্বীকৃত। এই পর্যায়ের অনুষঙ্গ থাকে উকুট বা স্থায়ীবাদ্য। অনেক গুরু এই পর্যায়কে স্থায়ী নৃত্য বলেও অভিহিত করেন। পল্লভী-নৃত্যের বিস্তৃতিপর্ব।

পল্লভীও নৃত্য পর্যায়ের অন্তর্গত। নৃত্যশিল্পীর মাধুর্যময় সঞ্চালন এবং দ্রুত ছন্দোময় পদচালনা পল্লভীর অঙ্গ। পল্লভী একটি বিশেষ রাগাশ্রয়ী হয় এবং সেই রাগের নামেই অভিহিত হয়। যেমন আরভী পল্লভী আরভী, রাগনির্ভর। পল্লভী অনেক সময় একাধিক রাগাশ্রয়ী হয়ে থাকে, তখন আর তা রাগের নামে অভিহিত হয় না।

এই অংশটি ওড়িশি নৃত্যের সর্বাধিক গীতিময় ও লাবণ্যময় অংশ। অভিনয় পর্যায়টি লিরিক নির্ভর । এখানেই শিল্পী হাতের মুদ্রা ও মুখের অভিব্যক্তিতে অনুভুতির প্রকাশ করেন। এখানে প্রতিটি মুদ্রাই বিশেষ অর্থসম্পন্ন। জয়দেব, কবিসূর্য, উপেন্দ্র ভঞ্চ, গোপালকৃষ্ণ এবং বনমালি দাসের গীতিকবিতা অভিনয়ের জন্য নেওয়া হয়।

যদিও মধ্যযুগীয় কবিদের যেমন কালী পট্টনায়েকের গীতিকবিতা এই অনুষ্ঠানের পক্ষে উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়। বর্তমানে অন্যান্য ভাষার খ্যাতনামা কবিদের গীতিকবিতাতেও ওড়িশি নৃত্য নিবদ্ধ করার পরীক্ষা চলছে। রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে পরীক্ষা করে এ ব্যাপারে সংযুক্তাই পথিকৃত হয়েছেন।

মোক্ষ-হলো শেষ পর্যায়ে যেখানে নৃত্যশিল্পী নির্বাণের জন্য সর্বশক্তিমানের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। এখানে দ্রুতগতির নৃত্যে উকুট হয় এবং সাধারণত দেবী দুর্গার স্তুতি করা হয়। ওড়িশি নৃত্যের চরম পরিণতি মোক্ষ পর্যায়ে যা দর্শক এবং নৃত্যশিল্পীর ওপর এক চিরন্তন প্রভাব রেখে যায। ওড়িশি নৃত্যের বিশেষত্ব এর অভিনব ও অনুপম ভঙ্গিমা।

অন্য কোনো নৃত্যে এত যথাযথভাবে শিল্পশাস্ত্র অনুসৃত হয় না। এই জন্য ওড়িশি নৃত্যে এত সুন্দর ভাস্কর্যভঙ্গি দেখা যায়। ত্রিভঙ্গি আঙ্গিকের জন্য ওড়িশি নৃত্য বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যায়িত। এই নৃত্যে কোমরের সাল (Torso movement) কালে শিল্পীর দেহ ডাইনে, বাঁয়ে, সামনে, পিছনে সঞ্চালিত হয়, কখনও কখনও বর্তুলাকারেও সঞ্চালিত হয়।

যেসব বিশেষ মুদ্রা ওড়িশি নৃত্যে ব্যবহৃত হয় সেগুলো হলো অসংযুক্ত হস্তের ক্ষেত্রে ধনু, তাম্বুল, পুষ্প, বাণ, বলয় (বলয়া), বস্ত্রা: এবং সংযুক্ত হস্তের ক্ষেত্রে রতি, গবাক্ষ ও প্রদীপ। সারিমন, পহপট, যতি, ঝুলা, আডতালি, ঝম্পা এবং অর্জঝম্পা তাল ওড়িশি নৃত্যে ব্যবহৃত হয়। এই নৃত্যের পরিচ্ছদেরও বৈশিষ্ট্য আছে।

 

ওড়িশি নৃত্য অলকা কানুনগো

 

খন্ডুয়া বা মণিয়াবন্ধি এবং সম্বলপুরী নামে পরচিত পট্ট বস্ত্র (সিল্কের শাড়ি) ওড়িশি নৃত্যশিল্পী পরেন। তবে শাড়ি পরার পদ্ধতিও দুধরনের। গতিপুঅদের রীতিতে সামনে কুঁচি পরিবৃত অথবা মাহারীদের মতো ধূতি পরার রীতি অনুসারে ৷ গহনার মধ্যে থেকে বেঙ্গপাতিয়া (কোমরবন্ধনী), তাহিত বা বাজুবন্ধ (হাতের জন্য), বটফল বা বাইচুরি (বালার মতো)।

যদিও আগে সোনার গহনা ব্যবহৃত হতো, বর্তমানে রূপোর গহনাও ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া টাহিয়া নামক একটি লম্বা কাঠের ওপর গাঁথা ফুলের দণ্ড বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। বড়দেউলের রীতি অনুসারে টাহিয়া প্রথমে শ্রীজগন্নাথকে অর্পণ করা হয়; তার পর মাহারী এটিকে কেশনিবদ্ধ করেন।

ওড়িশি গানে হিন্দুস্তানি ধ্রুপদী গানের ধারা অনুসৃত হয় এবং দক্ষিণ ভারতের কুচিপুড়ী ও ভরতনাট্যম নৃত্যের রীতিপদ্ধতির সঙ্গে ওড়িশি নৃত্যের বহুলাংশে সাদৃশ্য আছে। সম্ভবত এই রাজ্যের ভৌগোলিক অবস্থান এর জন্য দায়ী। উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যবর্তী হওয়ার প্রথা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উভয়দিকের প্রভাবেই ওড়িশি নৃত্য প্রভাবিত হয়েছে।

যেসব পণ্ডিত শিক্ষক, নৃত্যশিল্পী ও সংগীতবিদদের জন্য ওড়িশি নৃত্য সমগ্র বিশ্বে জনপ্রিয় হয়েছে তাদের নাম ওড়িশি নৃত্যের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। নতুবা ওড়িশি নৃত্য হয়তো আজো পর্যন্ত ইতিহাসের পাতাতেই নিবদ্ধ থাকতো, কোনোদিনই প্রকাশ্যে উপস্থাপিত হতে পারতো না ।

 

আরও দেখুনঃ

Leave a Comment