আধুনিক ও পাশ্চাত্য নৃত্যধারা । লোকনৃত্যের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য এবং আবশ্যকতা

আধুনিক ও পাশ্চাত্য নৃত্যধারা সময়ের সাথে সাথে আমাদের দেশে পরিচিতি ও জনপ্রিয় হয়েছে। কিছু বিষয় আমাদের নৃত্যধারা সাথে মিশেছে। আমাদের নৃত্যশিল্পীদের অনেকেই পাশ্চাত্য নৃত্যধারাকে আমাদের নৃতরীতির সাথে মিশিয়ে নতুন আঙ্গীক তৈরি করেছেন।

আধুনিক ও পাশ্চাত্য নৃত্যধারা । লোকনৃত্যের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য এবং আবশ্যকতা

[ আধুনিক ও পাশ্চাত্য নৃত্যধারা । লোকনৃত্যের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য এবং আবশ্যকতা ]

পরিচয়, বিশেষত্ব ও বেশভূষা:

যুগে যুগে কালে কালে ধর্মীয়, রাষ্ট্রনৈতিক এবং সামাজিক বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বেশভূষা, রীতি-নীতি, সাহিত্য, শিল্প প্রভৃতি সব কিছুরই পরিবর্তন ঘটছে। এ পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। কারণ গতিশলিতার মধ্যেই থাকে জীবনের স্পন্দন, গতিহীনতাই মত্যু। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে এই গতিবেগ “আমাদের চৈতন্যে রসচাঞ্চল্য সঞ্চার করে তাকে প্রবলভাবে জাগিয়ে রাখে। কোনো ব্যাপারকে নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করাতে হলে আমাদের চৈতন্যকে এইরকম বেগবান করে তুলতে হয়। নৃত্যও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রাচীন কাল থেকে নানা বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে নৃত্যকলার ঘটছে ব্রুম-রূপান্তরণ। বৈচিত্র্য পিয়াসী মানুষের নিত্যনূতন চাহিদা নিবৃত্তির জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রের মত নৃত্যকে নিয়েও চলেছে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার অন্যতম ফলশ্রুতি হচ্ছে আধুনিক নৃত্যধারা এবং এর রূপকার হিসাবে রবীন্দ্রনাথকেই জনকের সম্মান দিলে অত্যুক্তি হয় না।

শাস্ত্রীয় নিগড়মত্তে স্বচ্ছন্দবিহারী সরল দেহছন্দের সুষম প্রাণময় উপস্থাপনই হচ্ছে আধুনিক নৃত্যের বৈশিষ্ট্য। তবে একথাও ঠিক যে আধুনিক নৃত্য সম্পর্ণে ভাবে শাশ্বনিরপেক্ষ নয় অর্থাৎ প্রয়োজনবোধে শাস্ত্রীয় এবং লোকনৃত্য হতে আধুনিক নৃত্য উপাদান আহরণ করে তার আধুনিকীকরণ করে নিয়েছে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও তাঁর একাধিক নৃত্যনাট্যে কথাকলি, ভরতনাট্যম, মণিপুরী প্রভৃতি বিভিন্ন নৃত্যশৈলী থেকে উপাদান সংগ্রহ করেছেন।

আধুনিক নৃত্যের আর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে এই ননৃত্যে “বিচিত্র সূরে সমাবেশের জোরে কথোপকথনের ছন্দ সচল ও জোরালো হয়ে উঠেছে, তালও প্রথাগত নিয়ম থেকে মক্তি পেয়ে নিজের আবেগকে অবাধে প্রকাশ করেছে। কোথাও কোথাও আধুনিক সাহিত্যের গদ্য কবিতার মতো ভাব আপনাকে ছন্দের বন্ধন থেকে মক্তি দিয়েছে। নৃত্যের সেই বন্ধনহীন রূপে নতেন আকৃতি নিয়ে নাটকীয় সংঘাতের মধ্যে এক অকৃত্রিম রস ও শক্তিকে জাগিয়ে তুলেছে [ ভারতের নৃত্যকলা গায়ত্রী চট্টোপাধ্যায়, পূঃ ২৮৯]।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর একাধিক নৃত্যনাট্যের মধ্যে তাল মিশ্রণ ঘটিয়ে বৈচিত্র্য এনেছেন। আধুনিক নৃত্যের অন্যতম আর একটি উল্লেখ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে এই নৃত্য মদ্রোপরিকীর্ণ— হয়। অনায়াস চলন অর্থাৎ স্বাভাবিক গতিভঙ্গী তথা পাদবিক্ষেপ ও হস্তচালনায় এর সৌন্দর্য। তাই আধুনিক নৃত্যে প্রতিভাবান শিল্পীর নিজ সৃষ্টির স্বাক্ষর রাখবার সুযোগ আছে। এই প্রসঙ্গে নৃত্যগর, উদয়শঙ্করের অবদান অস্বীকার করা যায় না। বর্তমানেও আধুনিক নৃত্য নিয়ে অনেক প্রতিভাবান নৃত্য শিল্পী নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।

বেশভূষা :

আধুনিক নৃত্যে স্বাভাবিকতার চেতনার ঢেউয়ের দ্বারা বেশভূষাও যে নিঃশ্রিত হবে সে কথা বলাই বাহুল্য। বেশভূষা প্রসঙ্গে ‘জাভা যাত্রীর পত্রে সাধারণ নৃত্যসজ্জায় সজ্জিত দুটি অল্প বয়সের মেয়ের প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, *— এমনতরো বাহল্যবর্জিত সুপরিচ্ছন্নতার সামঞ্জস্য আমি কখনও দেখিনি। আমাদের নত’কী বাইজীদের আঁটি পায়জামার উপর অত্যন্ত জবড়জঙ্গ কাপড়ের অসৌষ্ঠবতা চিরদিন আমার ভারী কুশ্রী লেগেছে। তাদের প্রচুর গয়না ঘাঘরা ওড়না অত্যন্ত ভারী দেহ মিলিয়ে প্রথমেই মনে হয় সাজানো একটা মন্ত বোঝা।” আধুনিক নৃত্যের বেশভূষাও সর্বপ্রকার বাহল্য বা চাকচিক্য বর্জিত। বিশেষ ভাবাভিনয় বা চরিত্র উপযোগী বেশভূষাই এই নৃত্যে পরিধান করা হয়।

 

 

পাশ্চাত্য নৃত্যধারা :

ভারতীয় নৃত্যধারার তুলনায় পাশ্চাত্য নত্যকে নবীনই বলা চলে। অবশ্য পাশ্চাত্য দেশগুলিতেও বহ, প্রাচীনকাল থেকেই নানাপ্রকার লোকনৃত্যের প্রচলন ছিল। পঞ্চদশ শতাব্দী থেকেই পাশ্চাত্য নৃত্যের একটি পরিশীলিত আঙ্গিকের সন্ধান পাওয়া যায়। ফ্রান্সকে আধুনিক পাশ্চাত্য নৃত্যের জন্মস্থান বলা হয়। এর নিম্নলিখিত দাইটি প্রকার বর্তমানে প্রচলিত— (১) ব্যালে (Ballet) এবং (২) বলরাম ডাজে (Ballroom Dances ) ।

(১) ব্যালে (Ballet):

ব্যালে নৃত্যের মাধ্যমে কোনো কাহিনী বা বিশেষ ভাবকে রূপদান করা হয়। ভারতীয় নৃত্যে কোনো বিশেষ ভাব বা কাহিনীর রূপায়ণে গ্রীবা, নয়ন, হস্ত ইত্যাদির দ্বারা বহুপ্রকার মদ্রার সাহায্য নেওয়া হয়, কিন্তু ব্যালেতে মদ্রোধিক্য একেবারেই নেই। এই নৃত্যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালনই মংখ্য এবং এর শিল্প সম্মত প্রয়োগ উৎকর্ষতার উপরই ব্যালের সৌন্দর্য নির্ভরশীল। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে ব্যালের জয়যাত্রার সংচনা হয় এবং রাশিয়া ও ফরাসী দেশে এই নৃত্যের সর্বোত্তম বিকাশ ঘটে। বর্তমানে অবশ্য আমেরিকা, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশে ব্যালের যথেষ্ট উন্নতি ঘটেছে ।

(২) বলরুম ড্যান্সেজ (Ballroom Dances) :

বলরাম ড্যান্সেজকে এক ধরণের হাল্কা প্রমোদন,ত্য বলা চলে। সাধারণতঃ যে কোনও উৎসব অনুষ্ঠান প্রমোদাগার, বড় হোটেল, রেস্তোরাঁ ইত্যাদিতে বলরাম ড্যান্সেজ হয়ে থাকে। বাদ্যবৃন্দের সঙ্গে আলিঙ্গনবন্ধ স্ত্রীপরাষের যগ্ম নতোকেই বলরাম ড্যাসেজ বা সংক্ষেপে বল ড্যান্স বলা হয়। এই নাত্যে খুব বেশী শিক্ষিত-পটুত্বের প্রয়োজন হয় না, তবে পদবিক্ষেপ (Stepping) সম্বন্ধে কিছুটা ওয়াকিবহাল হতে হয়। নৃত্যকালে সঙ্গিনীর বাম হস্ত থাকে সঙ্গীর দক্ষিণ কম্বের উপর এবং অপর পক্ষের (পারেেষর ) দক্ষিণ হস্ত সঙ্গিনীর কটিবেষ্টন করে রাখে। এই নৃত্যের মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাম হল ফক্সট্রট, (Foxtrot ), রনট ( Bontrot), ওয়াল (Waltz) ইত্যাদি।

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন